চুয়াডাঙ্গা ১০:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৩০ বছরের ঐতিহ্য সংকটে: হারিয়ে যেতে বসেছে মুম্বইয়ের বিশ্বখ্যাত ডাব্বাওয়ালা সংস্কৃতি

Padma Sangbad
২৫

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট:
ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বইয়ের অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্য ‘ডাব্বাওয়ালা’ ব্যবস্থা আজ অস্তিত্ব সংকটে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লক্ষ লক্ষ অফিসকর্মীর কাছে ঘরের রান্না করা খাবার সময়মতো পৌঁছে দিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন ডাব্বাওয়ালারা। কিন্তু করোনা মহামারি, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ সংস্কৃতি এবং অনলাইন খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের উত্থানে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই অনন্য পেশা।
প্রতিদিন ভোরে সাদা টুপি ও সাদা পোশাক পরিহিত ডাব্বাওয়ালারা শহরের বিভিন্ন বাড়ি থেকে খাবারের টিফিন সংগ্রহ করে ট্রেন, সাইকেল ও হেঁটে নির্দিষ্ট অফিস বা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেন। দুপুরের খাবার শেষে খালি টিফিন আবার মালিকের বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয় একটি বিশেষ ‘আলফানিউমেরিক কোড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে, যেখানে প্রযুক্তি বা জিপিএস ছাড়াই নিখুঁতভাবে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়।
ধারণা করা হয়, উনিশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ আমলে বোম্বে শহরে এই সেবার সূচনা হয়। ১৮৯০ সালে মহাদেও বাচ্ছে নামের এক ব্যক্তি প্রায় ১০০ কর্মী নিয়ে আধুনিক ডাব্বাওয়ালা পরিষেবার ভিত্তি স্থাপন করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি মুম্বইয়ের সংস্কৃতি ও কর্মজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
ডাব্বাওয়ালাদের সাফল্য শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচিত হয়েছে। তাদের দক্ষতা ও স্বল্প ব্যয়ে কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর গবেষণা করেছে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল। ২০০৩ সালে ব্রিটেনের তৎকালীন প্রিন্স চার্লসও মুম্বইয়ের চার্চগেট স্টেশনে এসে ডাব্বাওয়ালাদের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।
একসময় প্রায় ৪,৫০০ ডাব্বাওয়ালা প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার টিফিন সরবরাহ করতেন। কিন্তু ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং কর্মীরা বাসা থেকে কাজ শুরু করায় ডাব্বাওয়ালাদের চাহিদা হঠাৎ করেই কমে যায়। অনেক কর্মী পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন।
বর্তমানে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ও ‘হাইব্রিড’ কর্মব্যবস্থার কারণে বহু কর্মী সপ্তাহে কয়েকদিন মাত্র অফিসে যান। ফলে আগের মতো নিয়মিত খাবার সরবরাহের প্রয়োজন কমে গেছে। মুম্বই টিফিন বক্স সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে নিবন্ধিত ডাব্বাওয়ালার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪,৫০০; বর্তমানে তা কমে প্রায় ১,৫০০ জনে নেমে এসেছে।
এদিকে অনলাইন খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও ক্লাউড কিচেনের জনপ্রিয়তা ডাব্বাওয়ালাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এখন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই বিভিন্ন ধরনের খাবার অর্ডার করা যায়, ফলে ঘরের রান্না করা খাবার বহনের প্রয়োজনীয়তা অনেকের কাছে কমে গেছে।
অনেক সাবেক ডাব্বাওয়ালা জানিয়েছেন, একসময় এই পেশা থেকে মাসে ২০ হাজার টাকার বেশি আয় হলেও বর্তমানে জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় যেতে হয়েছে। কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ আবার বিকেলে অন্য প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত কাজ করছেন।
প্রবীণ ডাব্বাওয়ালাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, নতুন প্রজন্ম আর এই পেশায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তরুণরা অধিক আয়ের চাকরি বা ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে মুম্বইয়ের গর্বের এই ঐতিহ্যবাহী পেশা আগামী দিনে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একসময় সময়নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও নির্ভুল সেবার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ডাব্বাওয়ালারা আজ টিকে থাকার সংগ্রামে লড়ছেন। আধুনিকতার প্রবাহে হারিয়ে যেতে বসেছে মুম্বইয়ের শতবর্ষী এক ঐতিহ্য।
ছবি : সংগ্রহ কৃত।

আপডেট : ১২:২৪:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

১৩০ বছরের ঐতিহ্য সংকটে: হারিয়ে যেতে বসেছে মুম্বইয়ের বিশ্বখ্যাত ডাব্বাওয়ালা সংস্কৃতি

আপডেট : ১২:২৪:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
২৫

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট:
ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বইয়ের অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্য ‘ডাব্বাওয়ালা’ ব্যবস্থা আজ অস্তিত্ব সংকটে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লক্ষ লক্ষ অফিসকর্মীর কাছে ঘরের রান্না করা খাবার সময়মতো পৌঁছে দিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন ডাব্বাওয়ালারা। কিন্তু করোনা মহামারি, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ সংস্কৃতি এবং অনলাইন খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের উত্থানে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই অনন্য পেশা।
প্রতিদিন ভোরে সাদা টুপি ও সাদা পোশাক পরিহিত ডাব্বাওয়ালারা শহরের বিভিন্ন বাড়ি থেকে খাবারের টিফিন সংগ্রহ করে ট্রেন, সাইকেল ও হেঁটে নির্দিষ্ট অফিস বা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেন। দুপুরের খাবার শেষে খালি টিফিন আবার মালিকের বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয় একটি বিশেষ ‘আলফানিউমেরিক কোড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে, যেখানে প্রযুক্তি বা জিপিএস ছাড়াই নিখুঁতভাবে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়।
ধারণা করা হয়, উনিশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ আমলে বোম্বে শহরে এই সেবার সূচনা হয়। ১৮৯০ সালে মহাদেও বাচ্ছে নামের এক ব্যক্তি প্রায় ১০০ কর্মী নিয়ে আধুনিক ডাব্বাওয়ালা পরিষেবার ভিত্তি স্থাপন করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি মুম্বইয়ের সংস্কৃতি ও কর্মজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
ডাব্বাওয়ালাদের সাফল্য শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচিত হয়েছে। তাদের দক্ষতা ও স্বল্প ব্যয়ে কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর গবেষণা করেছে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল। ২০০৩ সালে ব্রিটেনের তৎকালীন প্রিন্স চার্লসও মুম্বইয়ের চার্চগেট স্টেশনে এসে ডাব্বাওয়ালাদের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।
একসময় প্রায় ৪,৫০০ ডাব্বাওয়ালা প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার টিফিন সরবরাহ করতেন। কিন্তু ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং কর্মীরা বাসা থেকে কাজ শুরু করায় ডাব্বাওয়ালাদের চাহিদা হঠাৎ করেই কমে যায়। অনেক কর্মী পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন।
বর্তমানে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ও ‘হাইব্রিড’ কর্মব্যবস্থার কারণে বহু কর্মী সপ্তাহে কয়েকদিন মাত্র অফিসে যান। ফলে আগের মতো নিয়মিত খাবার সরবরাহের প্রয়োজন কমে গেছে। মুম্বই টিফিন বক্স সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে নিবন্ধিত ডাব্বাওয়ালার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪,৫০০; বর্তমানে তা কমে প্রায় ১,৫০০ জনে নেমে এসেছে।
এদিকে অনলাইন খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও ক্লাউড কিচেনের জনপ্রিয়তা ডাব্বাওয়ালাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এখন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই বিভিন্ন ধরনের খাবার অর্ডার করা যায়, ফলে ঘরের রান্না করা খাবার বহনের প্রয়োজনীয়তা অনেকের কাছে কমে গেছে।
অনেক সাবেক ডাব্বাওয়ালা জানিয়েছেন, একসময় এই পেশা থেকে মাসে ২০ হাজার টাকার বেশি আয় হলেও বর্তমানে জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় যেতে হয়েছে। কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ আবার বিকেলে অন্য প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত কাজ করছেন।
প্রবীণ ডাব্বাওয়ালাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, নতুন প্রজন্ম আর এই পেশায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তরুণরা অধিক আয়ের চাকরি বা ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে মুম্বইয়ের গর্বের এই ঐতিহ্যবাহী পেশা আগামী দিনে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একসময় সময়নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও নির্ভুল সেবার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ডাব্বাওয়ালারা আজ টিকে থাকার সংগ্রামে লড়ছেন। আধুনিকতার প্রবাহে হারিয়ে যেতে বসেছে মুম্বইয়ের শতবর্ষী এক ঐতিহ্য।
ছবি : সংগ্রহ কৃত।