“২৬ মার্চ: বিজয়ের গল্প শুধু ইতিহাসে নয়, আমাদের রক্তে”

মোঃ আব্দুর রহমান অনিক।।
২৬ মার্চ — বাংলাদেশের জন্মদিন। এটি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি এক রক্তাক্ত প্রভাতফেরির নাম। ১৯৭১ সালের এই দিনে আমরা শুধু একটি দেশ পাইনি, পেয়েছিলাম একটি স্বপ্ন — অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, মাথা উঁচু করে বাঁচার স্বপ্ন। কিন্তু ৫৩ বছর পরও কি আমরা সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলেছি? নাকি বিজয়ের মর্মবাণীকে আটকে রেখেছি রাজনৈতিক আলোচনা আর গালগল্পে?।
২০২৫ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ ৫৫ বছরে পদার্পণ করল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নেতৃত্বে যে স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, তা ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ নেয়। এই ৫৫ বছরে বাংলাদেশ অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে এবং অনেক অর্জনও করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে উন্নতি — এসব ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে চলেছে।
বিজয় মানে শুধু ‘বীরের রক্তে’ অর্জিত স্বাধীনতা নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্বে মিশে আছে তার ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সংগ্রামের ইতিহাস। বাংলার মাটি, নদী, খাদ্যাভ্যাস, লোকসংগীত, সাহিত্য এবং বীরত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ — প্রতিটি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার স্বকীয়তা গড়ে তুলেছে।
১৯৭১ সালের বিজয় কেবল যুদ্ধজয়ের গল্প নয়; এটি ছিল হানাদারদের বিরুদ্ধে সংস্কৃতির এক অবিস্মরণীয় বিজয়। পাকিস্তানি শাসকেরা আমাদের ভাষা, সাহিত্য, নৃত্যগীতকে ‘অপসংস্কৃতি’ বলেছিল। কিন্তু আমরা রাইফেলের পাশাপাশি বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান, জসীমউদদীনের কবিতা, শিল্পীর তুলির অঙ্কনে। আমাদের অস্ত্র ছিল শুধু বুলেট নয়, ছিল বাঙালি সংস্কৃতির অপরাজেয় শক্তিও।
মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশ, কিন্তু শুধু রক্ত দিয়ে দেশ টিকিয়ে রাখা যায় না — প্রয়োজন আদর্শ, সততা ও ঐক্য। প্রতিবছর ২৬ মার্চে আমরা জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দেই, প্রভাতফেরি করি। কিন্তু এই দিনটির প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে যদি আমরা প্রতিজ্ঞা করি:
– আমি কখনও দুর্নীতির অংশ হব না।
– আমি ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সব মানুষকে সম্মান করব।
– আমি আমার সন্তানকে শেখাবো, ‘বাংলা ভাষা’ শুধু একটা সাধারণ ভাষা নয়, এটি আমাদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া মাতৃভাষা।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমাদের লড়াই নতুন নতুন শত্রুদের বিরুদ্ধে — দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা, জলবায়ু সংকট, সাম্প্রদায়িকতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য। এটি শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়, ভবিষ্যৎ গড়ারও লক্ষ্যে কাজ করা । আমরা একবার জিতেছি স্বাধীনতায়, এবার আমাদের জিততে হবে সমৃদ্ধিতে, ন্যায়বিচারে এবং জাতীয় ঐক্যে।।

























