চুয়াডাঙ্গা ০৪:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“দর্শনা চটকাতলা বা কলেজ মোড়: পরিচিতি দোকান পরিবেষ্টিত চত্বরের লোকেশন ১১৭”

Padma Sangbad

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":["default"],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{"addons":1},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":true,"containsFTESticker":false}

২৫

মোঃ বজলুর রহমান, থানাপাড়া, দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা।।

ছুটির দিন।
দুপুরবেলার চটকাতলা!
আমাদের দর্শনা কলেজ মোড়!
এই চত্বরে এলে অন্য এক ধরনের অনুভুতি বা ভালো লাগা তৈরি হয়।এই ভালোলাগা অনেকের!
এই ভালোলাগা আমারো একান্ত আপন, অনেকদিনের।

ছুটির দিন!
দুপুরবেলার এই সময় এলাকাটা বেশ খানিকটা নিরব হয়ে পড়ে। এই নীরবতা কেন জানি আমার বেশ ভালো লাগে! একান্তেই উপভোগ করি! যা ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমাকে আমার শৈশব, কৈশোর, ফেলে আসা যৌবনের দিনগুলিতে।
বাড়ি থেকে এই চত্বর, হাঁটা পথে মাত্র পাঁচ মিনিটের।সেই ভালোলাগা প্রাপ্তির প্রত্যাশায় গত মাসে এবার যখন বাড়ি গেলাম দুপুরে ভাত খেয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে এলাম শতবর্ষের পুরাতন এই চটকাতলা বা শিরিষ গাছের সুশীতল ছায়াতলে।

একা একাই বসে ছিলাম দর্শনা ডাকঘর পিছনে রেখে। স্মৃতির পাতাগুলি খুলে দেখছিলাম মাইনুদ্দিনের বন্ধ দোকানের সামনের পাতা কাঠের বেঞ্চে বসে! মঈনুদ্দিন ওরফে মইন আজ নেই,বেশ কিছুদিন হলো গত হয়েছে। মাইনুদ্দিন বা মঈন যাকে আমি ভাই বলেই জানতাম। তিনি ছিলেন দর্শনার প্রিয় মুখ।
ছোট্ট ভ্যারাইটি স্টোরের সাথে ছিল পত্রিকার ব্যবসা।প্রতিবছর ‘দেশ’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যা এখান থেকেই সংগ্রহ করতাম। আমাদের অনেকের জন্য ঈদ সংখ্যাও রেখে দিতেন। আমরা সুযোগমতো সংগ্রহ করে নিতাম। এখনকার ছেলেমেয়েরা এগুলো মনে হয় হাতে ধরে দেখে না!তাদের আঙ্গুলগুলো অন্য কাজে ব্যস্ত!

আশরাফ চাচা! বাবার ছোট ভাই! তার সৌজন্যে এক সময় এখান থেকেই দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক একতা, মাসিক বেগম পত্রিকা বাড়িতে যেতে। আশরাফ চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা বিয়ে শাদি করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। সুতরাং বেগম পত্রিকা তার কোন কাজে আসতো না।এই পত্রিকাটি মূলত বড় ফুফু এবং মা চাচীরা দেখতেন। মনে পড়ে তাঁরা সেখান থেকে সংগ্রহ করতেন নাদুসনুদুস ছোট্ট শিশুদের ছবি এবং সুন্দর সুন্দর নাম! চাচা পরপারে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা!

হেলে পড়া দুপুর!
মঈনের দোকানে বসে সামনে তাকিয়ে দেখি আক্তার হোসেন লালু দুপুরের পর দোকানে বসা ছেলেকে বাড়ি পাঠিয়ে নিজে এসে বসলো। দূর থেকে আমাকে দেখে শুভেচ্ছা বিনিময় করলো। চোখের ঈশারায় তার কাছে এসে বসতে আহবান জানালো। আমি পরে আসার সম্মতি সূচক মাথা নাড়লাম।
আক্তার লালু আমার প্রাথমিক স্কুল জীবনের ক্লাসমেট। একসাথে ক্লাস ওয়ান থেকে টু পর্যন্ত পড়েছি। এরপর ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ও আর স্কুলে ফিরে আসেনি। সংসারের প্রয়োজনে শৈশবেই দায়িত্ব নিয়ে ফেলে পরিবারের! তখন থেকেই ইনকামের উদ্দেশ্যে টুকটাক কাজে নেমে পড়ে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সম্ভবত লালুই এই অঞ্চলের প্রথম দোকানদার।
যতটুকু মনে পড়ে তার দোকানটি ছিল বর্তমান পৌরসভার সামনে।
পৌরসভা ঘোষিত হয় ১৯৯০ সালে। প্রথমে এটি ছিল ইউনিয়ন কাউন্সিল, পরবর্তীতে ইউনিয়ন পরিষদ এরপর পৌরসভা। তখন দোকানটি পরিচালনা করতেন তৎকালীন ইউনিয়ন কাউন্সিলের সেক্রেটারি আব্বাস চাচার ভাতিজা।দোকানটি স্বাধীনতা পরবর্তী সময় বেশ কিছু দিন বন্ধ ছিল।এই দোকানের পাশে ছিল একটা তুত গাছ। ছোটবেলায় এই গাছ থেকে পাকা তুত ফল পেড়ে খাবার স্মৃতি এখনো মনে পড়ে।

লালু এবং তার পরিবার দোকানটি আব্বাস চাচার কাছ থেকে কিনে নিয়ে বর্তমান স্থানে নিয়ে আসে। এখন দোকানটি সেমি পাকা। এখানে ব্যবসা করেই লালু বৃদ্ধ হতে চলল।

চটকা তলার আর এক আজব চরিত্র আমাদের সকলের প্রিয় বেশ বয়স্ক মোজাম্মেল চাচা। যার ছিল চায়ের দোকান।তার চায়ের পানি কখনোই গরম থাকত না। কলেজ মোড়ের দোকান। অনেক নেতা টাইপের অবাধ্য ছাত্র বিনা পয়সায় চা খাওয়ার চেষ্টা করত। সুতরাং মোজাম্মেল চাচার এক কথা, “পানি ঠান্ডা, এখন চা হবে না”। কিন্তু যদি মনে করতেন এখন কাস্টমারদের চা খাওয়াতে হবে তাহলে তার চায়ের পানি হঠাৎ গরম হয়ে যেত!সাথে সিঙ্গাড়া,ডাল পুরি বা অন্য কোন তেলে ভাজা সামনে চলে আসতো। এভাবেই চালাতেন চাচা তার চায়ের দোকান। চাচা গত হয়েছেন। ছেলেরা দেখে এখন দোকান টা।

এই মোড়ের আর এক চরিত্র চৌধুরী! পুরো নাম জানিনা! টাইটেল “চৌধুরী” এই নামেই সকলে আমরা তাকে চিনতাম!নোয়াখালীর মানুষ! ডাকঘরের স্টাফ। ডাকঘরের সামনে একটি খড়ের ঘর বেঁধে একাই বসবাস করত। চাকরি শেষ, চৌধুরী ফিরে গেছে দেশের বাড়ি নোয়াখালী।
মোড়ের মাথায় বারেক চাচার ফার্নিচারের দোকান। চাচা গত হয়েছেন। ছেলেরা দোকানটির ভার নিয়েছে।

এই মোড়ের লোকেশন নাম্বার: ১১৭।
পরিচিতি: দোকান পরিবেষ্টিত চত্বর।

এমন ছোট্ট পরিচয় এই এলাকার মান খানিকটা ক্ষুন্ন হয়।
দর্শনা কলেজ,বালিকা বিদ্যালয়, পূর্ব রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,নতুন থানা চত্বর, ডাকঘর, জেলা পরিষদ ডাক বাংলো, অডিটেরিয়াম কাম কমিউনিটি সেন্টার, দর্শনা ভ্যাট এন্ড কাস্টমস, টিএন্ডটি অফিস, শিশুসর্গ, পশু হাসপাতাল, উদ্ভিদ সঙ্গোনিরোধ অফিস, স্বাস্থ ও পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক, হিন্দোল সংগীত পরিষদ,অনির্বাণ থিয়েটার, সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক সংগঠন, গন উন্নয়ন গ্রন্থাগার সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যলয়সহ গুরুত্তপূর্ণ বেশ কয়েকটি অফিস।

এ সমস্ত স্থানগুলোতে যাতায়েত করতে হলে প্রথমেই পৌঁছুতে হবে চটকাতলা মোড়ে। যে কারণে সব সময় চটকাতলায় থাকে মানুষের ভিড়ে মুখোরিত। অথচ ওই গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল স্থান চটকাতলা মোড়ে এবং প্রধান সড়কের দু পাশে এখনও রয়েছে শতবর্ষি ৮ টা চটকাগাছ।এ গাছগুলোর বেশ কিছু বড় বড় ডাল শুকিয়ে গেছে। শুকনো ওই ডালগুলো যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চটকাতলায় বেশ কিছু দোকানসহ অলস মানুষের ভিড়ে থাকে জমজমাট অবস্থা।

শতবর্ষী শিরিষ গাছ!
গাছগুলি বয়স পরিচিতিতে বলা হচ্ছে শতবর্ষী। আমাদের এই চটকাগাছ বা শিরিষ গাছ যার বৈজ্ঞানিক নাম আলবিজিয়া লিবব্যাক (Albizia lebbeck)! স্থানীয় নাম কড়ই, সৃষ্টিকড়ই, এন্ডিকড়ই ইত্যাদি।

গাছগুলির বয়স সম্পর্কে ধারণা পেতে আসুন আমরা ইতিহাসের পাতা ঘেটে আসি।

১৮১৬ এবং ১৮১৯ সালের স্থানীয়ভাবে ফেরী ব্যবস্থাপনা ও রক্ষনাবেক্ষণ,সড়ক/ সেতু নির্মাণ ও মেরামতের জন্য বৃটিশ সরকার কর্তৃক কর ধার্যের আইন প্রণীত হয়।

১৮১৭ সনে তৎকালীন বৃটিশ লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে বা আইন প্রণয়নকারী পরিষদে জিলা বোর্ড সেস কমিটি বিল উত্থাপিত হয় এবং ঐ বছরেই তা আইনে পরিণত হয়।

এই আইনের অধীন প্রতিটি জেলায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে জেলা বোর্ড সেস কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটি প্রধান কাজ ছিল করের হার নির্ধারণ, কর আদায় এবং রাস্তঘাট নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় মেরামত কাজে অর্থ ব্যয় করা।

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর দেশের অর্থনীতি ও আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বৃটিশ সরকার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে।

প্রেক্ষিতে ১৮৭০ সালে বেঙ্গল চৌকিদারী আইন প্রণয়ন করে। এই গ্রাম চৌকিদারী আইন পাশের মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলে এক স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়।

১৮৭১ সালে দশম বেঙ্গল এ্যাক্ট এর অধীনে একটি রোড কমিটি গঠিত হয়। ১৮৭১ সাল হতে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত এ কমিটির অস্তিত্ব ছিল।স্থানীয় সরকার গঠনের এটিই ছিল প্রাথমিক পদক্ষেপ।

১৮৮৫ সাল।
লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট এ্যাক্ট বলে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় ১৬টি জেলায় বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড গঠিত হয়। ঢাকা, চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, যশোর, খুলনা,হুগলী, হাওড়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম, ফরিদপুর,পাবনা ও পাটনা।
আমাদের ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড নদীয়া। এই ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের অন্তর্গত ছিল রানাঘাট, কৃষ্ণনগর,কুষ্টিয়া মেহেরপুর চুয়াডাঙ্গা।

মনে করা হয় এই মহাকুমার শহর গুলির মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে রাস্তা তৈরি পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের এই রাস্তার পাশে লাগানো হয় ছায়া দানকারী এই শিরিষ গাছ গুলি। ১৮৮৫ সালকে যদি শুরুর সময় ধরা হয় তাহলে গাছগুলোর বয়স ১৩৫ বছরের বেশি।

এতদিনের বিষয়!
রাস্তার পাশের অন্যান্য গাছগুলি ক্ষয়ক্ষতি হলেও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ডাকবাংলোর পাশের গাছগুলি এখনও রয়ে গেছে কালের সাক্ষী হিসাবে।
বসে বসে আজ আমরা সেই কথাই ভাবছি!

আপডেট : ০১:৪০:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৪

“দর্শনা চটকাতলা বা কলেজ মোড়: পরিচিতি দোকান পরিবেষ্টিত চত্বরের লোকেশন ১১৭”

আপডেট : ০১:৪০:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৪
২৫

মোঃ বজলুর রহমান, থানাপাড়া, দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা।।

ছুটির দিন।
দুপুরবেলার চটকাতলা!
আমাদের দর্শনা কলেজ মোড়!
এই চত্বরে এলে অন্য এক ধরনের অনুভুতি বা ভালো লাগা তৈরি হয়।এই ভালোলাগা অনেকের!
এই ভালোলাগা আমারো একান্ত আপন, অনেকদিনের।

ছুটির দিন!
দুপুরবেলার এই সময় এলাকাটা বেশ খানিকটা নিরব হয়ে পড়ে। এই নীরবতা কেন জানি আমার বেশ ভালো লাগে! একান্তেই উপভোগ করি! যা ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমাকে আমার শৈশব, কৈশোর, ফেলে আসা যৌবনের দিনগুলিতে।
বাড়ি থেকে এই চত্বর, হাঁটা পথে মাত্র পাঁচ মিনিটের।সেই ভালোলাগা প্রাপ্তির প্রত্যাশায় গত মাসে এবার যখন বাড়ি গেলাম দুপুরে ভাত খেয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে এলাম শতবর্ষের পুরাতন এই চটকাতলা বা শিরিষ গাছের সুশীতল ছায়াতলে।

একা একাই বসে ছিলাম দর্শনা ডাকঘর পিছনে রেখে। স্মৃতির পাতাগুলি খুলে দেখছিলাম মাইনুদ্দিনের বন্ধ দোকানের সামনের পাতা কাঠের বেঞ্চে বসে! মঈনুদ্দিন ওরফে মইন আজ নেই,বেশ কিছুদিন হলো গত হয়েছে। মাইনুদ্দিন বা মঈন যাকে আমি ভাই বলেই জানতাম। তিনি ছিলেন দর্শনার প্রিয় মুখ।
ছোট্ট ভ্যারাইটি স্টোরের সাথে ছিল পত্রিকার ব্যবসা।প্রতিবছর ‘দেশ’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যা এখান থেকেই সংগ্রহ করতাম। আমাদের অনেকের জন্য ঈদ সংখ্যাও রেখে দিতেন। আমরা সুযোগমতো সংগ্রহ করে নিতাম। এখনকার ছেলেমেয়েরা এগুলো মনে হয় হাতে ধরে দেখে না!তাদের আঙ্গুলগুলো অন্য কাজে ব্যস্ত!

আশরাফ চাচা! বাবার ছোট ভাই! তার সৌজন্যে এক সময় এখান থেকেই দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক একতা, মাসিক বেগম পত্রিকা বাড়িতে যেতে। আশরাফ চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা বিয়ে শাদি করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। সুতরাং বেগম পত্রিকা তার কোন কাজে আসতো না।এই পত্রিকাটি মূলত বড় ফুফু এবং মা চাচীরা দেখতেন। মনে পড়ে তাঁরা সেখান থেকে সংগ্রহ করতেন নাদুসনুদুস ছোট্ট শিশুদের ছবি এবং সুন্দর সুন্দর নাম! চাচা পরপারে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা!

হেলে পড়া দুপুর!
মঈনের দোকানে বসে সামনে তাকিয়ে দেখি আক্তার হোসেন লালু দুপুরের পর দোকানে বসা ছেলেকে বাড়ি পাঠিয়ে নিজে এসে বসলো। দূর থেকে আমাকে দেখে শুভেচ্ছা বিনিময় করলো। চোখের ঈশারায় তার কাছে এসে বসতে আহবান জানালো। আমি পরে আসার সম্মতি সূচক মাথা নাড়লাম।
আক্তার লালু আমার প্রাথমিক স্কুল জীবনের ক্লাসমেট। একসাথে ক্লাস ওয়ান থেকে টু পর্যন্ত পড়েছি। এরপর ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ও আর স্কুলে ফিরে আসেনি। সংসারের প্রয়োজনে শৈশবেই দায়িত্ব নিয়ে ফেলে পরিবারের! তখন থেকেই ইনকামের উদ্দেশ্যে টুকটাক কাজে নেমে পড়ে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সম্ভবত লালুই এই অঞ্চলের প্রথম দোকানদার।
যতটুকু মনে পড়ে তার দোকানটি ছিল বর্তমান পৌরসভার সামনে।
পৌরসভা ঘোষিত হয় ১৯৯০ সালে। প্রথমে এটি ছিল ইউনিয়ন কাউন্সিল, পরবর্তীতে ইউনিয়ন পরিষদ এরপর পৌরসভা। তখন দোকানটি পরিচালনা করতেন তৎকালীন ইউনিয়ন কাউন্সিলের সেক্রেটারি আব্বাস চাচার ভাতিজা।দোকানটি স্বাধীনতা পরবর্তী সময় বেশ কিছু দিন বন্ধ ছিল।এই দোকানের পাশে ছিল একটা তুত গাছ। ছোটবেলায় এই গাছ থেকে পাকা তুত ফল পেড়ে খাবার স্মৃতি এখনো মনে পড়ে।

লালু এবং তার পরিবার দোকানটি আব্বাস চাচার কাছ থেকে কিনে নিয়ে বর্তমান স্থানে নিয়ে আসে। এখন দোকানটি সেমি পাকা। এখানে ব্যবসা করেই লালু বৃদ্ধ হতে চলল।

চটকা তলার আর এক আজব চরিত্র আমাদের সকলের প্রিয় বেশ বয়স্ক মোজাম্মেল চাচা। যার ছিল চায়ের দোকান।তার চায়ের পানি কখনোই গরম থাকত না। কলেজ মোড়ের দোকান। অনেক নেতা টাইপের অবাধ্য ছাত্র বিনা পয়সায় চা খাওয়ার চেষ্টা করত। সুতরাং মোজাম্মেল চাচার এক কথা, “পানি ঠান্ডা, এখন চা হবে না”। কিন্তু যদি মনে করতেন এখন কাস্টমারদের চা খাওয়াতে হবে তাহলে তার চায়ের পানি হঠাৎ গরম হয়ে যেত!সাথে সিঙ্গাড়া,ডাল পুরি বা অন্য কোন তেলে ভাজা সামনে চলে আসতো। এভাবেই চালাতেন চাচা তার চায়ের দোকান। চাচা গত হয়েছেন। ছেলেরা দেখে এখন দোকান টা।

এই মোড়ের আর এক চরিত্র চৌধুরী! পুরো নাম জানিনা! টাইটেল “চৌধুরী” এই নামেই সকলে আমরা তাকে চিনতাম!নোয়াখালীর মানুষ! ডাকঘরের স্টাফ। ডাকঘরের সামনে একটি খড়ের ঘর বেঁধে একাই বসবাস করত। চাকরি শেষ, চৌধুরী ফিরে গেছে দেশের বাড়ি নোয়াখালী।
মোড়ের মাথায় বারেক চাচার ফার্নিচারের দোকান। চাচা গত হয়েছেন। ছেলেরা দোকানটির ভার নিয়েছে।

এই মোড়ের লোকেশন নাম্বার: ১১৭।
পরিচিতি: দোকান পরিবেষ্টিত চত্বর।

এমন ছোট্ট পরিচয় এই এলাকার মান খানিকটা ক্ষুন্ন হয়।
দর্শনা কলেজ,বালিকা বিদ্যালয়, পূর্ব রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,নতুন থানা চত্বর, ডাকঘর, জেলা পরিষদ ডাক বাংলো, অডিটেরিয়াম কাম কমিউনিটি সেন্টার, দর্শনা ভ্যাট এন্ড কাস্টমস, টিএন্ডটি অফিস, শিশুসর্গ, পশু হাসপাতাল, উদ্ভিদ সঙ্গোনিরোধ অফিস, স্বাস্থ ও পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক, হিন্দোল সংগীত পরিষদ,অনির্বাণ থিয়েটার, সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক সংগঠন, গন উন্নয়ন গ্রন্থাগার সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যলয়সহ গুরুত্তপূর্ণ বেশ কয়েকটি অফিস।

এ সমস্ত স্থানগুলোতে যাতায়েত করতে হলে প্রথমেই পৌঁছুতে হবে চটকাতলা মোড়ে। যে কারণে সব সময় চটকাতলায় থাকে মানুষের ভিড়ে মুখোরিত। অথচ ওই গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল স্থান চটকাতলা মোড়ে এবং প্রধান সড়কের দু পাশে এখনও রয়েছে শতবর্ষি ৮ টা চটকাগাছ।এ গাছগুলোর বেশ কিছু বড় বড় ডাল শুকিয়ে গেছে। শুকনো ওই ডালগুলো যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চটকাতলায় বেশ কিছু দোকানসহ অলস মানুষের ভিড়ে থাকে জমজমাট অবস্থা।

শতবর্ষী শিরিষ গাছ!
গাছগুলি বয়স পরিচিতিতে বলা হচ্ছে শতবর্ষী। আমাদের এই চটকাগাছ বা শিরিষ গাছ যার বৈজ্ঞানিক নাম আলবিজিয়া লিবব্যাক (Albizia lebbeck)! স্থানীয় নাম কড়ই, সৃষ্টিকড়ই, এন্ডিকড়ই ইত্যাদি।

গাছগুলির বয়স সম্পর্কে ধারণা পেতে আসুন আমরা ইতিহাসের পাতা ঘেটে আসি।

১৮১৬ এবং ১৮১৯ সালের স্থানীয়ভাবে ফেরী ব্যবস্থাপনা ও রক্ষনাবেক্ষণ,সড়ক/ সেতু নির্মাণ ও মেরামতের জন্য বৃটিশ সরকার কর্তৃক কর ধার্যের আইন প্রণীত হয়।

১৮১৭ সনে তৎকালীন বৃটিশ লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে বা আইন প্রণয়নকারী পরিষদে জিলা বোর্ড সেস কমিটি বিল উত্থাপিত হয় এবং ঐ বছরেই তা আইনে পরিণত হয়।

এই আইনের অধীন প্রতিটি জেলায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে জেলা বোর্ড সেস কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটি প্রধান কাজ ছিল করের হার নির্ধারণ, কর আদায় এবং রাস্তঘাট নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় মেরামত কাজে অর্থ ব্যয় করা।

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর দেশের অর্থনীতি ও আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বৃটিশ সরকার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে।

প্রেক্ষিতে ১৮৭০ সালে বেঙ্গল চৌকিদারী আইন প্রণয়ন করে। এই গ্রাম চৌকিদারী আইন পাশের মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলে এক স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়।

১৮৭১ সালে দশম বেঙ্গল এ্যাক্ট এর অধীনে একটি রোড কমিটি গঠিত হয়। ১৮৭১ সাল হতে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত এ কমিটির অস্তিত্ব ছিল।স্থানীয় সরকার গঠনের এটিই ছিল প্রাথমিক পদক্ষেপ।

১৮৮৫ সাল।
লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট এ্যাক্ট বলে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় ১৬টি জেলায় বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড গঠিত হয়। ঢাকা, চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, যশোর, খুলনা,হুগলী, হাওড়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম, ফরিদপুর,পাবনা ও পাটনা।
আমাদের ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড নদীয়া। এই ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের অন্তর্গত ছিল রানাঘাট, কৃষ্ণনগর,কুষ্টিয়া মেহেরপুর চুয়াডাঙ্গা।

মনে করা হয় এই মহাকুমার শহর গুলির মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে রাস্তা তৈরি পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের এই রাস্তার পাশে লাগানো হয় ছায়া দানকারী এই শিরিষ গাছ গুলি। ১৮৮৫ সালকে যদি শুরুর সময় ধরা হয় তাহলে গাছগুলোর বয়স ১৩৫ বছরের বেশি।

এতদিনের বিষয়!
রাস্তার পাশের অন্যান্য গাছগুলি ক্ষয়ক্ষতি হলেও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ডাকবাংলোর পাশের গাছগুলি এখনও রয়ে গেছে কালের সাক্ষী হিসাবে।
বসে বসে আজ আমরা সেই কথাই ভাবছি!