জলবায়ু বিপর্যয় ও বিপন্ন কৃষি: ক্ষতিপূরণ নয়, চাই স্থায়ী সুরক্ষার রূপরেখা

দৈনিক পদ্মা সংবাদ নিজস্ব ডেস্ক।।
প্রকৃতির পরিবর্তন এখন আর কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলা নিত্যদিনের কঠোর বাস্তবতা। ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য হারিয়ে দেশজুড়ে এখন চরম আবহাওয়ার তাণ্ডব চলছে। কোথাও তীব্র খরা ও অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, আবার কোথাও অসময়ের ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা। এর সরাসরি আঘাত এসে পড়ছে আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি ও কৃষকের ওপর। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একদিকে যেমন তীব্র তাপপ্রবাহ ও অনাবৃষ্টির কারণে ফসলের মাঠ শুকিয়ে কাঠ হচ্ছে, অন্যদিকে উপকূলীয় ও নিম্নাঞ্চলে লবণাক্ততা ও হঠাৎ বন্যায় একের পর এক ধানের ক্ষেত, সবজি বাগান ও ফলের বাগান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, এনজিও বা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ঋণ নিয়ে যে কৃষক নতুন স্বপ্নের চারা রোপণ করেন; মৌসুম শেষে দেখা যায় ফসল পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কিংবা পরিপক্ব হওয়ার আগেই শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। ফলে কয়েক হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন চাষিরা, যা তাঁদের এক অনিশ্চিত ঋণের চক্রে ঠেলে দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ প্রভাব কেবল কৃষকের একার আর্থিক ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না, এটি পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে এক বড় হুমকির মুখে ফেলছে। জলবায়ুর অভিঘাত সামলাতে না পেরে যদি একের পর এক কৃষক কৃষি কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন বা বারবার নিঃস্ব হতে থাকেন, তবে আগামী দিনে বাজার সিন্ডিকেট বা নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চেয়েও বড় সংকট হয়ে দেখা দেবে খাদ্যের ঘাটতি।
উন্নত বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের মাশুল আজ বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ক্ষতিপূরণের দাবি ও তহবিল পাওয়ার কথা উঠলেও, মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় সাহায্য অত্যন্ত অপ্রতুল। তবে কেবল সাময়িক ত্রাণ বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। আমাদের দরকার জলবায়ু-সহনশীল দীর্ঘমেয়াদী কৃষি কৌশল। কৃষি অধিদপ্তর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেগবান হতে হবে। খরা-সহনশীল, লবণাক্ততা-সহনশীল এবং হঠাৎ বন্যা সহ্য করতে পারে এমন বৈচিত্র্যময় জাতের নতুন নতুন বীজ দ্রুত কৃষকের দৌড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। পাশাপশি কৃষি বীমার মতো আধুনিক সুরক্ষাব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি, যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে কৃষক নিঃস্ব না হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুদ্ধ করে কৃষককে একা টিকে থাকতে দেওয়া কোনো টেকসই ব্যবস্থা হতে পারে না। আমাদের অর্থনীতি ও ১৮ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে কৃষি খাতকে জলবায়ু-বান্ধব ও সুরক্ষাবেষ্টিত করতে হবে এখনই। কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ, সুসংহত হবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা।
লেখক:মোঃ আব্দুর রহমান অনিক সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক পদ্মা সংবাদ

























