চুয়াডাঙ্গা ০৩:১১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের ৫ প্রস্তাব ১১ বোয়িং বিমানের ক্রয়াদেশ

Padma Sangbad
১৪

অনলাইন ডেস্ক।।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে এসে নিউইয়র্কে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অধিবেশনে যোগদানের পাশাপাশি সাইডলাইনে পৃথকভাবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। মধ্যপ্রাচ্যের সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রসারে দুই নেতার মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়। এর আগে তিনি তারেক রহমান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ও ভুটান, হাইতি, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্টের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১টি বোয়িং বিমান কেনার চুক্তির মাধ্যমে বোয়িং বিমান কেনার আদেশ দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩১৭-৮ জেট।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিশ্বমঞ্চে এই অংশগ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি নতুন, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার কৌশলগত সুযোগ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চলমান বৈশ্বিক মেরুকরণ এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে এই সফর বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক অর্জন বয়ে এনেছে। বিগত দিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের সক্রিয় উপস্থিতি এবং জোরালো ভূমিকার মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে দেশের হারানো ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল হয়েছে। এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে এসে নিউইয়র্কে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অধিবেশনে যোগদানের পাশাপাশি সাইডলাইনে পৃথকভাবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করছেন তিনি। এদিকে বাংলাদশকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্যতম ‘ঝুঁকিপূর্ণ দেশ’ আখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এজন্য বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ‘এককভাবে নয়, সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ’ গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় সময় বুধবার জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে ‘জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য উত্তরণ’ বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই আহ্বান জানান। এর আগে জাতিসংঘের অধিবেশনে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য ৫টি প্রস্তাব তুলে ধরেন তারেক রহমান। এছাড়া গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় বিকেল চারটায় জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জলবায়ু পরিবর্তনে ৫ প্রস্তাব: স্থানীয় সময় বুধবার জাতিসংঘ সদর দফতরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আহ্বানে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং টেকসই ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। জলাবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্টি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সরকারের কর্মপরিকল্পনা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, খাল খনন প্রভৃতি তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ০.৫ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আমাদের উপকূলীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আমাদের জিডিপির ১ শতাংশের সমপরিমাণ। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাও গুরুতর ঝুঁকির মুখে। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য রয়েছে। আমরা পাটজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং সার্কুলার অর্থনীতির উদ্যোগসহ সবুজ শিল্পের প্রসার ঘটাচ্ছি। একই সঙ্গে একটি জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার কাজ করছি। তবে এককভাবে আমাদের পক্ষে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ সক্ষমতা’ এই নীতির ভিত্তিতে সম্মিলিত পদক্ষেপ এখন অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় পাঁচ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

এগুলো হচ্ছেÑ প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সীমা বজায় রাখতে বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে হবে। জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন খাতে পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে আরো বেশি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক জলবায়ু উত্তরণ সম্ভব করতে হবে। সহজলভ্য অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করতে হবে। ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে এর অর্থ পুনঃপূরণ করতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, এ বছরের বাজেটে আমরা জলবায়ু অভিযোজনের জন্য প্রায় ৩.১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছি। তারপরও আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া আমরা বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছি। আগামী পাঁচ বছরে আমরা ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছি। একই সঙ্গে পানি সংরক্ষণ, বন্যার ঝুঁকি কমানো, জলাভূমি পুনরুজ্জীবিত করা এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে আমরা প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন করছি। পাশাপাশি, আমরা পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজের মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে নিচ্ছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ তার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করবে- এমন অংশীদারত্ব প্রত্যাশা করে। আসুন, আমরা একসঙ্গে কাজ করি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরো নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলি।
জাতিসংঘের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

১১টি বোয়িং বিমান কেনার চুক্তি : নিজেদের বিমানবহর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরো ১১টি বোয়িং বিমান কেনার আদেশ দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এই আদেশের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩১৭-৮ জেট। এর মাধ্যমে চলতি বছর বোয়িংয়ের কাছে বিমানের মোট অর্ডারের সংখ্যা দাঁড়াল ২৫টিতে, যার মধ্যে পূর্বে ১৪টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানের অর্ডার দেয়া হয়েছিল।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে নিউইয়র্কে গত বুধবার এই নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা দেয়া হয়, যেখানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিমানের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন জানান, বিমানবহর আধুনিকায়ন এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যেই এই অতিরিক্ত বিমানগুলো কেনা হচ্ছে।

বোয়িংয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই চুক্তিটি বিমানের চলমান বহর নবায়ন ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’ রুমির মতে, বিমানের নিজস্ব ফ্লিট বা বহর পরিকল্পনার চাহিদা অনুযায়ী এই অর্ডার দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশি যাত্রী, প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও পর্যটন খাতের যাতায়াত চাহিদা পূরণে জাতীয় পতাকাবাহী এই সংস্থাটি তাদের নেটওয়ার্ক প্রসারিত করতে এবং সক্ষমতা বাড়াতে চায়।

এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিকসহ মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, সরকার যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে আজ গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয়েছে। সেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আরো ১১টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে চুক্তি করেছে। তিনি বলেন, মার্কিন সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা, মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লান্ডাউ, আন্ডার সেক্রেটারি অব কমার্স উইলিয়াম কিমিট এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ চাহিদার ভিত্তিতেই বিমান কিনবে উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টর সম্প্রসারণ হচ্ছে, নতুন নতুন রুট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে নতুন উড়োজাহাজ প্রয়োজন।’ বোয়িং প্রতিনিধিদল পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে বলেও জানান তিনি।
ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে তারেক রহমানের সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বৈঠক করেন। মধ্যপ্রাচ্যের সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রসারে দুই নেতার মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির নিউইয়র্কে এক ব্রিফিংয়ে জানান, বুধবার দুই নেতার বৈঠক হয়েছে। তিনি জানান, বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা, রেমিট্যান্স, সমুদ্রপথে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন এবং সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
হুমায়ুন কবির বলেন, জাতিসংঘের মতো নিরপেক্ষ ফোরামে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের প্রায় ৮০ লাখ কর্মী কাজ করেন। কিন্তু সেখানকার চলমান সংঘাতের কারণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ রেমিট্যান্সে প্রভাব ফেলছে। এটি আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালীতে আমাদের পণ্যবাহী জাহাজ আটকে আছে। এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সংঘাতের দ্রুত সমাধান চান বলেও জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি আরো বলেন, ‘এই যুদ্ধের সমাধান হওয়ার পর হরমুজে আটকে থাকা জাহাজ যাতে চলাচল করতে পারে, সে অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা যাতে গভীর জ্বালানি সংকটে না পড়ি সে ব্যাপারে অনুরোধ জানিয়েছি।’

গেটস ফাউন্ডেশনের সিইওর সঙ্গে বৈঠক : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক সুজম্যান। বুধবার স্থানীয় সময় সকালে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থলে উচ্চপর্যায়ের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে জনস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান কর্মসূচি, সাশ্রয়ী ভ্যাকসিন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একই সঙ্গে বৈঠকে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণ, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষিত এসব স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমন্বিত ‘ডিজিটাল পাবলিক হেলথ কেয়ার সিস্টেম’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েও ফলপ্রসূ মতবিনিময় হয়।

প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর নিয়ে বুধবার নিউইয়র্ক সময় সন্ধ্যা ৭টায় ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলের লবিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে দিনের বিভিন্ন কর্মসূচির তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর, শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরে বলেন, সফরের দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য, কৃষি, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।

মাহদী আমিন বলেন, গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে বৈঠকে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ, কৃষকদের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

মাহদী আমিন বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসায় বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরো সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি জানান, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে হয়েছে। এতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অভিবাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরো জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে বলেও জানান মাহদী আমিন। জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি জানান, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন। নদী-খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন ও ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উভয় পর্যায়েই সংশ্লিষ্ট দেশ ও অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তিনি বলেন, চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা জানান তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, কূটনীতিতে সব দরজা এবং সব বিকল্প খোলা রাখতে হয়। আলোচনার পথ কখনো বন্ধ করা যায় না।

জাতিসংঘ সদর দফতরের কনফারেন্স রুম-৪-এ অনুষ্ঠিত ‘High-level Meeting to Address the Existential Threats Posed by Sea-Level Rise’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বক্তব্য দিয়েছেন। বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় ও দ্বীপরাষ্ট্রসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সৃষ্ট বহুমাত্রিক ও অস্তিত্বগত হুমকির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ, ন্যায়সংগত অর্থায়ন, অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আপডেট : ০১:৫৮:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের ৫ প্রস্তাব ১১ বোয়িং বিমানের ক্রয়াদেশ

আপডেট : ০১:৫৮:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৪

অনলাইন ডেস্ক।।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে এসে নিউইয়র্কে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অধিবেশনে যোগদানের পাশাপাশি সাইডলাইনে পৃথকভাবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। মধ্যপ্রাচ্যের সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রসারে দুই নেতার মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়। এর আগে তিনি তারেক রহমান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ও ভুটান, হাইতি, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্টের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১টি বোয়িং বিমান কেনার চুক্তির মাধ্যমে বোয়িং বিমান কেনার আদেশ দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩১৭-৮ জেট।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিশ্বমঞ্চে এই অংশগ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি নতুন, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার কৌশলগত সুযোগ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চলমান বৈশ্বিক মেরুকরণ এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে এই সফর বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক অর্জন বয়ে এনেছে। বিগত দিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের সক্রিয় উপস্থিতি এবং জোরালো ভূমিকার মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে দেশের হারানো ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল হয়েছে। এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে এসে নিউইয়র্কে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অধিবেশনে যোগদানের পাশাপাশি সাইডলাইনে পৃথকভাবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করছেন তিনি। এদিকে বাংলাদশকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্যতম ‘ঝুঁকিপূর্ণ দেশ’ আখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এজন্য বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ‘এককভাবে নয়, সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ’ গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় সময় বুধবার জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে ‘জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য উত্তরণ’ বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই আহ্বান জানান। এর আগে জাতিসংঘের অধিবেশনে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য ৫টি প্রস্তাব তুলে ধরেন তারেক রহমান। এছাড়া গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় বিকেল চারটায় জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জলবায়ু পরিবর্তনে ৫ প্রস্তাব: স্থানীয় সময় বুধবার জাতিসংঘ সদর দফতরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আহ্বানে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং টেকসই ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। জলাবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্টি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সরকারের কর্মপরিকল্পনা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, খাল খনন প্রভৃতি তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ০.৫ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আমাদের উপকূলীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আমাদের জিডিপির ১ শতাংশের সমপরিমাণ। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাও গুরুতর ঝুঁকির মুখে। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য রয়েছে। আমরা পাটজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং সার্কুলার অর্থনীতির উদ্যোগসহ সবুজ শিল্পের প্রসার ঘটাচ্ছি। একই সঙ্গে একটি জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার কাজ করছি। তবে এককভাবে আমাদের পক্ষে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ সক্ষমতা’ এই নীতির ভিত্তিতে সম্মিলিত পদক্ষেপ এখন অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় পাঁচ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

এগুলো হচ্ছেÑ প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সীমা বজায় রাখতে বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে হবে। জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন খাতে পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে আরো বেশি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক জলবায়ু উত্তরণ সম্ভব করতে হবে। সহজলভ্য অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করতে হবে। ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে এর অর্থ পুনঃপূরণ করতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, এ বছরের বাজেটে আমরা জলবায়ু অভিযোজনের জন্য প্রায় ৩.১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছি। তারপরও আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া আমরা বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছি। আগামী পাঁচ বছরে আমরা ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছি। একই সঙ্গে পানি সংরক্ষণ, বন্যার ঝুঁকি কমানো, জলাভূমি পুনরুজ্জীবিত করা এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে আমরা প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন করছি। পাশাপাশি, আমরা পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজের মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে নিচ্ছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ তার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করবে- এমন অংশীদারত্ব প্রত্যাশা করে। আসুন, আমরা একসঙ্গে কাজ করি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরো নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলি।
জাতিসংঘের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

১১টি বোয়িং বিমান কেনার চুক্তি : নিজেদের বিমানবহর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরো ১১টি বোয়িং বিমান কেনার আদেশ দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এই আদেশের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩১৭-৮ জেট। এর মাধ্যমে চলতি বছর বোয়িংয়ের কাছে বিমানের মোট অর্ডারের সংখ্যা দাঁড়াল ২৫টিতে, যার মধ্যে পূর্বে ১৪টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানের অর্ডার দেয়া হয়েছিল।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে নিউইয়র্কে গত বুধবার এই নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা দেয়া হয়, যেখানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিমানের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন জানান, বিমানবহর আধুনিকায়ন এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যেই এই অতিরিক্ত বিমানগুলো কেনা হচ্ছে।

বোয়িংয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই চুক্তিটি বিমানের চলমান বহর নবায়ন ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’ রুমির মতে, বিমানের নিজস্ব ফ্লিট বা বহর পরিকল্পনার চাহিদা অনুযায়ী এই অর্ডার দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশি যাত্রী, প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও পর্যটন খাতের যাতায়াত চাহিদা পূরণে জাতীয় পতাকাবাহী এই সংস্থাটি তাদের নেটওয়ার্ক প্রসারিত করতে এবং সক্ষমতা বাড়াতে চায়।

এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিকসহ মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, সরকার যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে আজ গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয়েছে। সেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আরো ১১টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে চুক্তি করেছে। তিনি বলেন, মার্কিন সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা, মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লান্ডাউ, আন্ডার সেক্রেটারি অব কমার্স উইলিয়াম কিমিট এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ চাহিদার ভিত্তিতেই বিমান কিনবে উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টর সম্প্রসারণ হচ্ছে, নতুন নতুন রুট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে নতুন উড়োজাহাজ প্রয়োজন।’ বোয়িং প্রতিনিধিদল পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে বলেও জানান তিনি।
ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে তারেক রহমানের সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বৈঠক করেন। মধ্যপ্রাচ্যের সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রসারে দুই নেতার মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির নিউইয়র্কে এক ব্রিফিংয়ে জানান, বুধবার দুই নেতার বৈঠক হয়েছে। তিনি জানান, বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা, রেমিট্যান্স, সমুদ্রপথে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন এবং সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
হুমায়ুন কবির বলেন, জাতিসংঘের মতো নিরপেক্ষ ফোরামে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের প্রায় ৮০ লাখ কর্মী কাজ করেন। কিন্তু সেখানকার চলমান সংঘাতের কারণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ রেমিট্যান্সে প্রভাব ফেলছে। এটি আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালীতে আমাদের পণ্যবাহী জাহাজ আটকে আছে। এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সংঘাতের দ্রুত সমাধান চান বলেও জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি আরো বলেন, ‘এই যুদ্ধের সমাধান হওয়ার পর হরমুজে আটকে থাকা জাহাজ যাতে চলাচল করতে পারে, সে অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা যাতে গভীর জ্বালানি সংকটে না পড়ি সে ব্যাপারে অনুরোধ জানিয়েছি।’

গেটস ফাউন্ডেশনের সিইওর সঙ্গে বৈঠক : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক সুজম্যান। বুধবার স্থানীয় সময় সকালে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থলে উচ্চপর্যায়ের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে জনস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান কর্মসূচি, সাশ্রয়ী ভ্যাকসিন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একই সঙ্গে বৈঠকে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণ, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষিত এসব স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমন্বিত ‘ডিজিটাল পাবলিক হেলথ কেয়ার সিস্টেম’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েও ফলপ্রসূ মতবিনিময় হয়।

প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর নিয়ে বুধবার নিউইয়র্ক সময় সন্ধ্যা ৭টায় ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলের লবিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে দিনের বিভিন্ন কর্মসূচির তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর, শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরে বলেন, সফরের দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য, কৃষি, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।

মাহদী আমিন বলেন, গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে বৈঠকে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ, কৃষকদের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

মাহদী আমিন বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসায় বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরো সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি জানান, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে হয়েছে। এতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অভিবাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরো জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে বলেও জানান মাহদী আমিন। জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি জানান, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন। নদী-খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন ও ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উভয় পর্যায়েই সংশ্লিষ্ট দেশ ও অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তিনি বলেন, চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা জানান তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, কূটনীতিতে সব দরজা এবং সব বিকল্প খোলা রাখতে হয়। আলোচনার পথ কখনো বন্ধ করা যায় না।

জাতিসংঘ সদর দফতরের কনফারেন্স রুম-৪-এ অনুষ্ঠিত ‘High-level Meeting to Address the Existential Threats Posed by Sea-Level Rise’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বক্তব্য দিয়েছেন। বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় ও দ্বীপরাষ্ট্রসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সৃষ্ট বহুমাত্রিক ও অস্তিত্বগত হুমকির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ, ন্যায়সংগত অর্থায়ন, অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।