পান হাটে দুই ঘণ্টায় ৭০ লাখ টাকার বেচাকেনা

কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতাঃ
মাত্র দুই ঘন্টার হাট। সেই হাটে কেনা বেচা হয় প্রায় ৭০ লাখ টাকা! শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া পান হাটে এমন জমজমাট কেনা বেচা হয়। সপ্তাহের শনি ও বুধবার নিয়ম করে দীর্ঘদিন চলছে এই হাট। স্থানীয় সহ বিভিন্ন উপজেলার পান চাষীরা এই হাটে পান বিক্রি করতে আসেন। দুর-দুরান্তের পাইকাররা পান কিনে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
পাকুন্দিয়া পৌর পান বাজারে ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় ব্যস্ততা। কারও হাতে পানের ভিরা, কেউ ব্যস্ত দরদামে, আবার কেউ বরজ থেকে তুলে আনা পান সাজিয়ে বসেছেন বিক্রির জন্য। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকাররা একের পর এক পান কিনে ভরে ফেলছেন বস্তা ও গাড়ি। সকাল গড়ানোর আগেই শেষ হয়ে যায় হাট। সময় লাগে মাত্র দুই ঘণ্টা। এই অল্প সময়েই পাটমহালে বিক্রি হয় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার পান। শীত মৌসুমে চাহিদা ও দাম বাড়লে প্রতিটি হাটে বেচাকেনার পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় কোটি টাকা।
পাকুন্দিয়ার স্থানীয় পানচাষিদের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও চাষিরা পান নিয়ে আসেন এখানে। আর মানসম্মত পান কিনতে ছুটে আসেন দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকারেরা।
হাটে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে মানুষের ভিড়। এক পাশে চাষিরা পান সাজিয়ে বসেছেন। কোথাও চলছে দরদাম, কোথাও পাইকারেরা পান বাছাই করছেন। কেউ মাথায়, কেউ ভ্যানে, আবার কেউ অটোরিকশায় করে পান নিয়ে ঢ়ুকছেন হাটে। কেনাবেচা শেষে পানের বস্তা ও আঁটি নিয়ে গন্তব্যের পথে ছুটছে অটোরিকশা ও পিকআপভ্যান।
পাটমহালের হাট এখন শুধু স্থানীয় চাষিদের পান বিক্রির জায়গা নয়, পাকুন্দিয়ার পান বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। এখানকার পান যাচ্ছে ঢাকা, গাজীপুর, কটিয়াদী, নরসিংদী, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পাকুন্দিয়ার চরফরাদী, এগারসিন্দুর, হোসেন্দী, নারান্দী ও সুখিয়া ইউনিয়ন এবং পৌরসভার বরাটিয়া, হিজলীয়া, লক্ষীয়া ও সৈয়দগাঁও এলাকায় পান চাষ হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৬৫ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ রয়েছে।
সারা বছরই এখানে লাল ডিঙ্গি ও গয়েসুর জাতের পান উৎপাদন হয়। স্থানীয় মাটি ও আবহাওয়া পান চাষের উপযোগী হওয়ায় ভালো মানের পান উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
পাকুন্দিয়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পানচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দরদরা, বরাটিয়া, হিজলীয়া, লক্ষীয়া, নামালক্ষীয়া, সৈয়দগাঁও, হোসেন্দী চরপাড়া, মির্জাপুর ও বাহাদিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পান চাষ হচ্ছে।
অনেক পরিবারে পান চাষের ইতিহাস বাপ-দাদার সময়ের। একটি পানের বরজকে ঘিরেই চলে একটি পরিবারের সংসার। অন্য অনেক ফসলের তুলনায় লাভজনক হওয়ায় নতুন করেও অনেকে পান চাষে যুক্ত হচ্ছেন।
চাষিরা বলেন, উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থা ভালো থাকলে পান থেকে সারা বছরই আয় করা সম্ভব। তবে রোগবালাই, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে লোকসানের আশঙ্কাও থাকে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো গেলে পান চাষ স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
নামালক্ষীয়া গ্রামের পানচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, তার বাপ-দাদারাও পান চাষ করেছেন। তিনিও প্রায় ৪০ বছর ধরে পান চাষ করে পাকুন্দিয়া বাজারে বিক্রি করছেন। পান চাষের আয় দিয়েই পরিবার নিয়ে মোটামুটি ভালোভাবে চলছেন তিনি।
হাটে আসা পানের পাইকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাকুন্দিয়ার পানের মান ভালো। বিশেষ করে লাল ডিঙ্গি ও গয়েসুর জাতের পানের চাহিদা বেশি। মানের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় দূরের পাইকারেরাও নিয়মিত এ হাটে আসেন।
বর্তমানে ভালো মানের এককুড়ি (২০ বিরাতে এককুড়ি, এক বিরাতে ১২০টি পান) ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
পান ব্যবসায়ী শুভ চক্রবর্তী বলেন, তার নিজেদের আড়ত রয়েছে। পাকুন্দিয়া থেকে পান কিনে কটিয়াদী, ভৈরব, নরসিংদী, করগাঁও ও নিকলীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। তার ভাষ্য, এখানে বিভিন্ন জাত ও মানের পান পাওয়া যায়। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই হাটের ওপর নির্ভর করছেন তিনি|
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূর-ই-আলম বলেন, পান একটি লাভজনক কৃষিপণ্য। বছরজুড়েই কৃষকেরা পান বিক্রি করে আয় করছেন। এ কারণে দিন দিন এ চাষের পরিধি বাড়ছে। পান চাষে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
























