চুয়াডাঙ্গা ০৯:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৃত্যুর গন্ধ মেখে যে বছর ফুল ফোটে

Padma Sangbad
২৬৯

বছর ঘুরে আবার এলো বৈশাখ ১৪৩৩ । রাস্তায় বৈশাখী শোভাযাত্রা, মুখে আলপনা, হাতে লাল-সাদা পাঞ্জাবি। বটতলায় পান্তা-ইলিশের গন্ধ মিশে যাচ্ছে ধুলোর সঙ্গে। এস সো রে উৎসব এসে গেছে। আমি ভাবছিলাম সেই মানুষগুলোর কথা, যাদের জন্য এই বছরটা আর নতুন নয় , আগের বছর থেকে এখনও বের হতে পারেননি।

বৈশাখ ১৪৩২ বিদায় নিয়েছে কিছু ক্ষত রেখে। দ্রব্যমূল্যের আগুনে পোড়া মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, বন্যায় ডুবে যাওয়া হাওরের ফসল, আর নদীভাঙনে বিলীন হওয়া আরও কিছু মানচিত্র এই সব নিয়েই তো নতুন বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা। কিন্তু পয়লা বৈশাখে কেউ এসব নিয়ে কথা বলে না। উৎসবের জন্য কান্না মানায় না এটা একটা অলিখিত সামাজিক চুক্তি।

বাংলা নববর্ষ আদতে ছিল একটি কৃষি উৎসব। আকবরের আমলে মুঘল রাজস্ব আদায়ের ফসল থেকে জন্ম নেওয়া এই দিনটির মূলে ছিল হিসাব-নিকাশ পাওনা-দেনার মিলিয়ে নেওয়া। হালখাতার সেই ঐতিহ্যে কিন্তু একটা সততা ছিল। বছর শেষে দোকানদার খাতা খুলে জিজ্ঞেস করতেন কতটা বাকি, কতটা মেটানো গেল। সেই প্রশ্নটা আজ আমাদের জাতীয় জীবনেও জিজ্ঞেস করা দরকার।

হালখাতার সেই প্রশ্নটা আজও প্রাসঙ্গিক কতটা বাকি, কতটা মেটানো গেল? সেই হিসাব না করে শুধু উদযাপন করলে উৎসব হয়, পরিবর্তন হয় না।

এই বৈশাখে আমার মনে হচ্ছে আমরা উৎসবকে ব্যবহার করছি ভুলে থাকার অস্ত্র হিসেবে। ঢাকায় বসে যারা রমনার বটমূলে গান শোনেন, তারা কি একবারও মনে করেন সেই চরের মানুষটির কথা, যার ঘর এই বছর নদীতে গেছে? বৈশাখের ঢোলের শব্দ কি পৌঁছায় সেই শিশুর কাছে, যে আজও স্কুলে যেতে পারেনি কারণ তার পরিবারের কাছে ভাতের চাল নেই?

আমি উৎসবের বিরুদ্ধে নই। মানুষ উৎসব করবে এটাই তো মানুষের প্রাণশক্তি। কিন্তু উৎসবের ভেতরেও কি একটু জায়গা রাখা যায় না সেই প্রশ্নের জন্য আমরা কোথায় আছি? বছর ঘুরলেই কি জীবন বদলায়? নাকি বদলের জন্য চাই সচেতন পদক্ষেপ, সমষ্টিগত সংকল্প?

বৈশাখ ১৪৩৩ আমাদের কাছে একটাই প্রশ্ন রেখে গেছে উৎসব কি একটা দিনের ঘটনা, নাকি একটা বছরের অর্জনের নাম? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে আজ পান্তা খাওয়ার আগে একবার ভাবুন এই বছর আপনি কী অর্জন করতে চান, শুধু নিজের জন্য নয়, আপনার পাশের মানুষটির জন্যও।

নতুন বছর মানে নতুন সূর্য এই কথা সত্য। কিন্তু সূর্য শুধু উঠলেই কাজ হয় না। সেই আলোতে কাজ করতে হয়, পথ চলতে হয়। শুভ নববর্ষ তখনই সত্যিকারের শুভ হবে, যখন সেই শুভ শুধু শব্দে নয়, কাজেও থাকবে।

মোঃ আব্দুর রহমান অনিক

সম্পাদকীয় কলামিস্ট, দৈনিক পদ্মা সংবাদ

আপডেট : ০২:২৬:২১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

মৃত্যুর গন্ধ মেখে যে বছর ফুল ফোটে

আপডেট : ০২:২৬:২১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
২৬৯

বছর ঘুরে আবার এলো বৈশাখ ১৪৩৩ । রাস্তায় বৈশাখী শোভাযাত্রা, মুখে আলপনা, হাতে লাল-সাদা পাঞ্জাবি। বটতলায় পান্তা-ইলিশের গন্ধ মিশে যাচ্ছে ধুলোর সঙ্গে। এস সো রে উৎসব এসে গেছে। আমি ভাবছিলাম সেই মানুষগুলোর কথা, যাদের জন্য এই বছরটা আর নতুন নয় , আগের বছর থেকে এখনও বের হতে পারেননি।

বৈশাখ ১৪৩২ বিদায় নিয়েছে কিছু ক্ষত রেখে। দ্রব্যমূল্যের আগুনে পোড়া মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, বন্যায় ডুবে যাওয়া হাওরের ফসল, আর নদীভাঙনে বিলীন হওয়া আরও কিছু মানচিত্র এই সব নিয়েই তো নতুন বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা। কিন্তু পয়লা বৈশাখে কেউ এসব নিয়ে কথা বলে না। উৎসবের জন্য কান্না মানায় না এটা একটা অলিখিত সামাজিক চুক্তি।

বাংলা নববর্ষ আদতে ছিল একটি কৃষি উৎসব। আকবরের আমলে মুঘল রাজস্ব আদায়ের ফসল থেকে জন্ম নেওয়া এই দিনটির মূলে ছিল হিসাব-নিকাশ পাওনা-দেনার মিলিয়ে নেওয়া। হালখাতার সেই ঐতিহ্যে কিন্তু একটা সততা ছিল। বছর শেষে দোকানদার খাতা খুলে জিজ্ঞেস করতেন কতটা বাকি, কতটা মেটানো গেল। সেই প্রশ্নটা আজ আমাদের জাতীয় জীবনেও জিজ্ঞেস করা দরকার।

হালখাতার সেই প্রশ্নটা আজও প্রাসঙ্গিক কতটা বাকি, কতটা মেটানো গেল? সেই হিসাব না করে শুধু উদযাপন করলে উৎসব হয়, পরিবর্তন হয় না।

এই বৈশাখে আমার মনে হচ্ছে আমরা উৎসবকে ব্যবহার করছি ভুলে থাকার অস্ত্র হিসেবে। ঢাকায় বসে যারা রমনার বটমূলে গান শোনেন, তারা কি একবারও মনে করেন সেই চরের মানুষটির কথা, যার ঘর এই বছর নদীতে গেছে? বৈশাখের ঢোলের শব্দ কি পৌঁছায় সেই শিশুর কাছে, যে আজও স্কুলে যেতে পারেনি কারণ তার পরিবারের কাছে ভাতের চাল নেই?

আমি উৎসবের বিরুদ্ধে নই। মানুষ উৎসব করবে এটাই তো মানুষের প্রাণশক্তি। কিন্তু উৎসবের ভেতরেও কি একটু জায়গা রাখা যায় না সেই প্রশ্নের জন্য আমরা কোথায় আছি? বছর ঘুরলেই কি জীবন বদলায়? নাকি বদলের জন্য চাই সচেতন পদক্ষেপ, সমষ্টিগত সংকল্প?

বৈশাখ ১৪৩৩ আমাদের কাছে একটাই প্রশ্ন রেখে গেছে উৎসব কি একটা দিনের ঘটনা, নাকি একটা বছরের অর্জনের নাম? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে আজ পান্তা খাওয়ার আগে একবার ভাবুন এই বছর আপনি কী অর্জন করতে চান, শুধু নিজের জন্য নয়, আপনার পাশের মানুষটির জন্যও।

নতুন বছর মানে নতুন সূর্য এই কথা সত্য। কিন্তু সূর্য শুধু উঠলেই কাজ হয় না। সেই আলোতে কাজ করতে হয়, পথ চলতে হয়। শুভ নববর্ষ তখনই সত্যিকারের শুভ হবে, যখন সেই শুভ শুধু শব্দে নয়, কাজেও থাকবে।

মোঃ আব্দুর রহমান অনিক

সম্পাদকীয় কলামিস্ট, দৈনিক পদ্মা সংবাদ