ইরানের শক্তিমত্তা দেখে রণে ভঙ্গ দিলেন ট্রাম্প

প্রাণবিনাশী রথচক্র থামল তা হলে। তবে অর্জুনের অব্যর্থ তীরের মতো ইরানের লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রে সুরক্ষিত মার্কিন সেনাঘাঁটি বিদ্ধ হওয়ার পর। তেহরানের প্রত্যাঘাতী শক্তি দেখে রণে ক্ষান্তি দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; তিনি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন। অনেকটা তড়িঘড়ি করেই। ইরাক ও কাতারে মার্কিন ঘাঁটি আক্রান্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। কাতারের মধ্যস্থতায়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আক্রান্ত হওয়ার পর ‘সার্বভৌমত্ব ও সম্মান সমুন্নত’ রাখতে বলে-কয়েই ‘অভাবনীয়’ পাল্টা আক্রমণ কেবল শুরু করেছিল তেহরান। আল জাজিরা জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর তেহরানে সাধারণ জনতাকে ‘বিজয় মিছিল’ করতে দেখা গেছে।
গতকাল বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টার দিকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আপাতত থামল। যদিও কার্যকরের কিছু পরই লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইসরায়েলের দুই মন্ত্রী তেহরানকে কাঁপিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। ট্রাম্প অবশ্য তাদের বেশ কড়া সুরেই বোমা
ফেলতে বারণ করেন। তবে আল জাজিরা জানিয়েছে, এই নিষেধের পরও ইরানের বাবলসার এলাকায় হামলা করেছে ইসরায়েল। ট্রাম্প নিজেও যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় নিরপেক্ষ ছিলেন না। তিনি আগে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করতে বলেন, এরও ছয় ঘণ্টা পর ইসরায়েল আক্রমণ বন্ধ করবে বলে জানান।
প্রথমে ইসরায়েলের নিরন্তর হামলা এবং পরে দূরপ্রান্ত থেকে উড়ে এসে আমেরিকার বোমারু বিমানের হামলার পর তেহরান যে এখন আর কারও কথায় নড়েচড়ে না, হুমকিধমকিতে বিচলিত নয়, মাথা নোয়ায় না তা স্পষ্ট। গতকাল ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার সশস্ত্র বাহিনীর বীরত্বের প্রশংসা করে বলেছেন, মাটি, মানুষ ও জাতির মর্যাদা সুরক্ষিত রাখতে তাদের এই দুঃসাহসিকতা ও আত্মত্যাগের জন্য তিনি কৃতজ্ঞ।
১৩ জুন প্রথমে অতর্কিতে কাপুরুষের মতো বিনা উসকানিতে ইরানে আকাশপথে সামরিক হামলা চালায় ইসরায়েল। প্রথম দিনেই সেনাপ্রধান ও ইসলামিক বিপ্লবী বাহিনীর প্রধানকে হারায় ইরান। ১২ দিনের হামলায় ইরান শীর্ষ জনাবিশেক জেনারেলকে হারিয়েছে, প্রাণ হারিয়েছেন জনাসাতেক শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী। সরকারি হিসাবে কম করে ৬১০ জন মানুষ ইরানে নিহত হয়েছেন।
কিন্তু দমবার দেশ নয় ইরান, বলেছিলেন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। প্রথম দিন থেকেই বুকের পাটা কাকে বলে, ইরান পাল্টা আঘাতে ইসরায়েলকে বিস্মিত, বিচলিত ও বিধ্বংস করে ছেড়েছে। আত্মম্ভরিতা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। সুরক্ষিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আয়রন ডোম ভেদ করে ইরানের আধুনিক প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো ইসরায়েলের অট্টালিকা এবং সামরিক ও গোয়েন্দা ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বোমারোধী পাতাল-আশ্রয় ব্যবস্থার বদৌলতে বড় প্রাণহানি এড়াতে পেরেছে ইসরায়েল। যুদ্ধবাদী দেশটি তবু অন্তত ২৮ জন বেসামরিককে হারিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন একটা পারমাণবিক প্রশ্নকে সামনে রেখে। পাছে ইরান পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলে। ওই একটা বোমাই তো যথেষ্ট ইসরায়েলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে। আর এ ভয়ে নব্বইটি পারমাণবিক বোমার মালিক ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ করে বসে। শেষতক না পেরে ‘পশ্চিমা প্রভু’কে অনুনয়-বিনয় করে ডেকে আনে। যুক্তরাষ্ট্রও ক্ষ্যাপাটে নেতার কথায় জড়িয়ে পড়ে যুদ্ধে। শনিবার ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা করে মার্কিন বোমারু বিমান। পরে ইরাকে ও কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে প্রত্যাঘাত করে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র যতগুলো বোমা মেরেছে, ইরানও পাল্টা হামলায় ততগুলো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই হামলা ইরান কাপুরুষের মতো চালায়নি, আগেভাগে বলে-কয়ে। এখন তিনপক্ষই এই যুদ্ধে ‘বিজয়’ দাবি করছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা ইরানের পারমাণবিক স্বপ্ন চুরমার করে ফেলেছে। আর তেহরান বলছে, ইরানের শক্তির কাছে শত্রুরা হার মেনেছে।
কিন্তু বিবিসির এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে যেমনটা বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পড়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একদিকে কংগ্রেসের অনুমোদন না নিয়ে ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ করায় ঘরে তার বিরুদ্ধে বিশেষ করে বিরোধী শিবির খুবই ক্ষিপ্ত। অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইসরায়েল তার কথা না শুনে ইরানে হামলা চালিয়েছে, আরও হামলার হুমকি দিচ্ছে। ফলে তার মোড়লি প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যদিকে তিনি যেহেতু দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর সমস্ত রসদ তিনি ধ্বংস করে দিয়েছেন। ফলে ইরানের কাছে কখনও পারমাণবিক বোমা পাওয়া গেলে তার দায়ভার কার? ইরান যদি ওই তিন কেন্দ্র থেকে আগেই পারমাণবিক রসদ সরিয়ে নিয়ে গোপনে অন্যত্র রাখে? আর তিনি কি আদৌ পারবেন এভাবে হামলার পর ইরানকে পারমাণবিক চুক্তিতে রাজি করাতে? ট্রাম্প যেন এই সমীকরণে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন। মহাভারতের অন্যতম যোদ্ধা-চরিত্রকে নিয়ে লেখা ‘কর্ণ পাঞ্চালীকে’ কবিতায় দেবেশ ঠাকুর যেমন অঙ্গরাজ কর্ণকে ‘রাহুগ্রস্ত সূর্যের চেয়েও অসহায়’ বলেছেন, তেমনি।
অবশ্য আশার আলো দেখছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী। শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল থানি গতকাল বলেছেন, দোহা এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে এবং কূটনীতির জয় হবে।’
কূটনীতির কথা গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্টও বলেছেন। মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান কূটনীতিতে বিশ^াস রাখে। তবে তার সরকার যাই করুক না কেন, ইরানি জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সব কিছু করবে।
এই কূটনীতির কথা বলেই ইরানে মার্কিন হামলা চালানোর আগে ‘দুই সপ্তাহ পর দেখা যাবে’ বলে একটা ‘আলোচনার জানালা’ খুলে দেওয়ার কৃতিত্ব নিতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প। আর সেই মোতাবেক ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও তার সতীর্থ নেতারা জেনেভায় ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও যান। কিন্তু কালক্ষেপণের ফাঁদ পেতে দুই সপ্তাহের বদলে দুই দিনের মাথায় ইরানের ভূমিতে আকাশপথে হামলা করে বসে ট্রাম্পের সামরিক বাহিনী। ফলে অনেকে সংশয় করছেন, পাল্টা আক্রমণে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা ইরানকে থামাতে তিনি আবার এই যুদ্ধবিরতির নামের ফাঁদ পাতেননি তো? ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাতের বিষয়ে যে হাস্যরস ট্রাম্প করেছেন, কিংবা ইসরায়েল প্রকাশ্যে একাধিবার সেই হুমকি দিয়েছে, এই ফাঁদ সেই অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী লক্ষ্যপূরণের হাতিয়ার হবে না তো?
এর আগে যুদ্ধ চলাকালে আল জাজিরা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হত্যার বা গুপ্তহত্যার শিকার হতে পারেন ধরে নিয়ে খামেনি তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি বাছাই করে ফেলেছেন। আবার খামেনি এই বার্তাও দিয়ে রেখেছেন, তিনি প্রাণ হারালেও জায়নবাদী অপশাসন ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের এই লড়াই বিজয় না পাওয়া পর্যন্ত চলতে থাকবে।

























