চুয়াডাঙ্গা ০৫:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এসেই বাজিমাত করেছেন যারা

Padma Sangbad
১৫

আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
নতুন রাজনৈতিক দল মানেই এখন আর দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস বা প্রজন্মের পর প্রজন্মের সংগঠন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে নতুন মুখ, নতুন বার্তা আর জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে অল্প সময়েই ক্ষমতার কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে কিছু দল। নিচের সাতটি উদাহরণ সেই দ্রুত উত্থানেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপ, যেখানে প্রচলিত রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন রাজনৈতিক দল জায়গা করে নিয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায়। ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেনÑ আজহারুল ইসলাম অভি

তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম, ভারত

তারকা থেকে রাজনৈতিক মঞ্চে

ভারতের তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য ছিল বড় দুটি রাজনৈতিক শিবিরের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে নতুন একটি শক্তি দ্রুত আলোচনায় আসেÑ তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে)। জনপ্রিয় অভিনেতা ও তারকা নেতা থালাপতি বিজয় এই দলটি গঠন করেন। দলটি গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই তামিল রাজনীতিতে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনার জন্ম দেয়, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে।

দলের জন্ম ও পটভূমি : ২০২৪ সালে অভিনেতা বিজয় আনুষ্ঠানিকভাবে তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন। দীর্ঘদিন ধরে তামিল চলচ্চিত্রজগতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা বিজয় ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বার্তা ও জনকল্যাণমূলক অবস্থান নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। দলটির মূল লক্ষ্য হিসেবে তিনি তুলে ধরেন স্বচ্ছ প্রশাসন, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ।

রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ : দল গঠনের পর থেকেই তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। দলটি গত রবিবার রাজ্য সরকার গঠন করে, তবে জনসমর্থন ও জনসমাবেশের মাধ্যমে দ্রুত একটি শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করেছে। বিজয়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে। চলচ্চিত্রজগতের বিশাল ভক্তগোষ্ঠী রাজনৈতিক ময়দানে তাদের প্রভাব ফেলছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

প্রচারণার নতুন ধারা : তামিলাগা ভেত্রি কাজাগামের প্রচারণা প্রচলিত রাজনৈতিক দলের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। বড় সমাবেশ, ডিজিটাল মাধ্যম এবং সরাসরি জনসংযোগের মাধ্যমে দলটি তরুণদের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে। দলটি নিজেদের প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে এবং ‘নতুন রাজনীতি’র ধারণাকে সামনে আনছে।

কেন আলোচনায় এসেছে দলটি?

বিশ্লেষকদের মতে, টিভিকের দ্রুত আলোচনায় আসার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছেÑ

# বিজয়ের ব্যাপক চলচ্চিত্র জনপ্রিয়তা

# তরুণ ভোটারদের মধ্যে নতুন নেতৃত্বের আকাক্সক্ষা

# প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থার সংকট

# সামাজিক মাধ্যমে শক্তিশালী উপস্থিতি

‘পরিবর্তনের রাজনীতি’র বার্তা : তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে টিভিকে এখনও নতুন শক্তি, তবে এটি ভবিষ্যতে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি, নেপাল

নতুন রাজনীতি ও বালেন্দ্র শাহ

নেপালের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত নতুন শক্তিগুলোর একটি হলো রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতি পুরনো কয়েকটি দলের আধিপত্যে সীমাবদ্ধ ছিল। দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নেতৃত্ব সংকটে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক হতাশা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতেই দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে নতুন রাজনৈতিক শক্তিটি।

দলের জন্ম ও দ্রুত উত্থান : ২০২২ সালের জুন মাসে সাংবাদিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব রবি লামিছানে এই দল গঠন করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও টেলিভিশন উপস্থাপনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন। দলটির মূল লক্ষ্য ছিল পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে স্বচ্ছতা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

নির্বাচনে চমক : দল গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই ২০২২ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। নবগঠিত দল হওয়া সত্ত্বেও তারা প্রতিনিধি পরিষদে ২০টি আসন জিতে চতুর্থ বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। এই ফলাফল নেপালের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

বালেন্দ্র শাহের প্রভাব : একই সময় নেপালের স্থানীয় রাজনীতিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন আসেÑ কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহের জয়। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নতুন রাজনৈতিক ঢেউ তৈরি করে। বিশ্লেষকদের মতে, বালেন্দ্র শাহ পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত হলে দলটির গ্রহণযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে। এই সমন্বয়ের পর দলটি জাতীয় রাজনীতিতে আরও শক্ত অবস্থানে পৌঁছায় এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে।

প্রচারণার ধরন ও জনসমর্থন : রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির প্রচারণা ছিল প্রচলিত দলের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক ও জনমুখী। সামাজিক মাধ্যম, সরাসরি জনসংযোগ এবং ‘পুরনো রাজনীতির বিকল্প’ এই বার্তা তাদের দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে দলটির গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

কেন এত দ্রুত সফল হলো দলটি?

বিশ্লেষকদের মতে, দলটির এই দ্রুত উত্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ ছিলÑ

# পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জন-অসন্তোষ

# দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অকার্যকারিতা

# রবি লামিছানের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা

# বালেন্দ্র শাহের রাজনৈতিক প্রভাব ও তরুণদের আকর্ষণ

# সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা

নেপালের রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির উত্থান এখন নতুন প্রজন্মনির্ভর রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল, ইউক্রেন

কাল্পনিক দল থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়

ইউক্রেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১৯ সালকে অনেক বিশ্লেষক ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্পের বছর’ বলে উল্লেখ করেন। কারণ, সে বছর এমন এক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে, যাদের অস্তিত্বের বয়স ছিল মাত্র এক বছরের কিছু বেশি। দলটির নামÑ ‘সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল’ (ঝবৎাধহঃ ড়ভ ঃযব চবড়ঢ়ষব)। আর এই দলের মুখ ছিলেন টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী ভলোদিমির জেলেনস্কি। একসময় যিনি টিভি পর্দায় কাল্পনিক প্রেসিডেন্টের চরিত্রে অভিনয় করতেন, বাস্তবে তিনিই হয়ে ওঠেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। শুধু তাই নয়, তার নতুন রাজনৈতিক দলও পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ইতিহাস গড়ে।

টিভি সিরিজ থেকে রাজনীতির ময়দানে : সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল নামটি প্রথমে ছিল একটি জনপ্রিয় ইউক্রেনীয় টেলিভিশন সিরিজের নাম। সেই সিরিজে জেলেনস্কি অভিনয় করেছিলেন এক সাধারণ স্কুল শিক্ষকের চরিত্রে, যিনি দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্যের কারণে হঠাৎ প্রেসিডেন্ট হয়ে যান। সিরিজটি ইউক্রেনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পরে সেই সিরিজের নামেই রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়। দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৮ সালে নিবন্ধিত হয়।

কয়েক মাসেই জনপ্রিয়তার বিস্ফোরণ : ২০১৮ সালের শেষ দিকে জেলেনস্কি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। তখনও অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। কারণ, তার কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না।

কিন্তু সামাজিক মাধ্যম, টেলিভিশন জনপ্রিয়তা এবং নতুন মুখ হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রচারণায় তিনি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, রাজনৈতিক সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র গঠনের কথা বলেন।

২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পেট্রো পরিশেনকোকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেন। দ্বিতীয় দফার ভোটে জেলেনস্কি প্রায় ৭৩ শতাংশ ভোট পানÑ যা ইউক্রেনের আধুনিক ইতিহাসে অন্যতম বড় বিজয়।

পার্লামেন্টেও একচ্ছত্র জয় : প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরই জেলেনস্কি পার্লামেন্ট ভেঙে আগাম নির্বাচনের ডাক দেন। সেই নির্বাচনে তার দল সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল অভাবনীয় সাফল্য পায়। ২০১৯ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে দলটি ৪৩ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে ২৫৪টি আসন জেতে। স্বাধীন ইউক্রেনের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো একক দল পার্লামেন্টে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিলÑ দলটির অধিকাংশ প্রার্থীই ছিলেন রাজনৈতিকভাবে একেবারে নতুন মুখ। অনেকেই এসেছিলেন ব্যবসা, আইটি, গণমাধ্যম কিংবা সিভিল সোসাইটি থেকে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বড় অংশের আগে কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাই ছিল না।

কেন এত দ্রুত সফল হলো দলটি?

বিশ্লেষকদের মতে, ‘ঝবৎাধহঃ ড়ভ ঃযব চবড়ঢ়ষব’-এর সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ ছিলÑ

# পুরনো রাজনৈতিক শ্রেণির প্রতি জনবিরক্তি

# দুর্নীতিবিরোধী শক্তিশালী জনমত

# জেলেনস্কির টেলিভিশন জনপ্রিয়তা

# সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক আধুনিক প্রচারণা

# তরুণ ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন

# সাধারণ মানুষের দল হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন

লা রিপুবলিক অঁ মার্শ, ফ্রান্স

এক বছরের মধ্যেই এলিসি প্রাসাদে

ফ্রান্সের রাজনীতিতে ২০১৭ সাল ছিল এক বিস্ময়ের বছর। বহু দশক ধরে দেশটির ক্ষমতা ঘুরে ফিরছিল মূলত সমাজতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল দুই রাজনৈতিক ধারার মধ্যে। ঠিক সেই সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে আবির্ভূত হয় এক নতুন দলÑ লা রিপুবলিক অঁ মার্শ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দলটি শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই জয় পায়নি, ফরাসি পার্লামেন্টেও বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দলের প্রতিষ্ঠাতা ইমানুয়েল ম্যাখোঁ তখন মাত্র ৩৯ বছর বয়সী। তিনি হয়ে ওঠেন ফ্রান্সের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী প্রেসিডেন্ট।

নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান : ২০১৬ সালের এপ্রিলে ইমানুয়েল ম্যাখোঁ নতুন রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে লা রিপুবলিক অঁ মার্শ গঠন করেন। তখন তিনি ফ্রান্স সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের হতাশা এবং পুরনো নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজেকে ‘ডান-বাম বিভাজনের বাইরে’ এক নতুন মুখ হিসেবে তুলে ধরেন। দলটির নামের অর্থ দাঁড়ায়Ñ ‘প্রজাতন্ত্র এগিয়ে চলেছে’। শুরু থেকেই দলটি তরুণ ভোটার, মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং পরিবর্তনকামী জনগণের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে থাকে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চমক : ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাখোঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কট্টর ডানপন্থি নেতা মারিন ল্য পেন। নির্বাচনী প্রচারণায় ম্যাখোঁ ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে অবস্থান, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আধুনিক উদারনীতির কথা বলেন। নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় তিনি প্রায় ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফরাসি রাজনীতিতে এটি ছিল দীর্ঘদিনের প্রচলিত দলীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে বড় ধরনের জনরায়।

পার্লামেন্টেও শক্ত অবস্থান : প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে লা রিপুবলিক অঁ মার্শ এবং তাদের মিত্ররা জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিলÑ দলটির অনেক প্রার্থীই ছিলেন রাজনীতিতে নতুন। কেউ এসেছিলেন ব্যবসা থেকে, কেউ শিক্ষকতা বা সামাজিক কাজ থেকে। প্রচলিত রাজনৈতিক পরিবারের বাইরে থেকেও তারা নির্বাচনে জয় পান।

কেন এত দ্রুত সফল হলো দলটি?

বিশ্লেষকদের মতে, দলটির দ্রুত সাফল্যের পেছনে কয়েকটি কারণ ছিলÑ

# পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের বিরক্তি

# নতুন ও তরুণ নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ

# ম্যাখোঁর মধ্যপন্থি অবস্থান

# আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণা

# ইউরোপপন্থি ও সংস্কারমুখী বার্তা

ফরাসি রাজনীতিতে লা রিপুবলিক অঁ মার্শ-এর উত্থান এখনও আধুনিক ইউরোপের দ্রুততম রাজনৈতিক সাফল্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

আম আদমি পার্টি, ভারত

আন্দোলন থেকে দিল্লির মসনদ

ভারতের রাজনীতিতে ২০১৩ সাল ছিল এক অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের বছর। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী দিল্লির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছিল কংগ্রেস ও বিজেপির মতো বড় দলগুলো। ঠিক সেই সময় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ভেতর থেকে উঠে আসে নতুন একটি রাজনৈতিক দলÑ আম আদমি পার্টি। মাত্র এক বছরের মধ্যে দলটি দিল্লির নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।

আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক দলে : ২০১১ সালে ভারতে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ব্যাপক গতি পায়। সমাজকর্মী আন্না হাজারের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। পরবর্তীতে আন্দোলনের একটি অংশ মনে করে, শুধু আন্দোলন করে নয়, সরাসরি রাজনীতিতে এসেই পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই ২০১২ সালের নভেম্বরে গঠিত হয় আম আদমি পার্টি।

দলটির নামের অর্থÑ ‘সাধারণ মানুষের দল’। শুরু থেকেই তারা নিজেদের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকল্প হিসেবে তুলে ধরে। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল দলটির প্রধান বার্তা।

প্রথম নির্বাচনেই চমক : দল গঠনের এক বছরের মধ্যেই ২০১৩ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেয় আম আদমি পার্টি। তখন অনেকেই দলটিকে গুরুত্ব দেননি। কারণ, তাদের সাংগঠনিক শক্তি সীমিত ছিল এবং অধিকাংশ প্রার্থীই ছিলেন নতুন মুখ। কিন্তু নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, দলটি ৭০টির মধ্যে ২৮টি আসনে জয় পেয়েছে। কংগ্রেসকে বড় ধাক্কা দিয়ে তারা দিল্লির দ্বিতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়। পরবর্তীতে কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন করেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তিনি প্রথমবারের মতো দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হন।

নতুন ধরনের প্রচারণা : আম আদমি পার্টির প্রচারণা ছিল প্রচলিত ভারতীয় রাজনীতির তুলনায় ভিন্ন। বড় বড় সমাবেশের পাশাপাশি তারা ঘরে ঘরে প্রচারণা চালায়। সামাজিক মাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবকভিত্তিক প্রচার এবং ছোট অনুদানের মাধ্যমে দলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। দলের সাধারণ প্রতীক, সাধারণ পোশাক এবং ‘সাধারণ মানুষের রাজনীতি’ ধারণা তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিশেষ প্রভাব ফেলে।

কেন এত দ্রুত সফল হলো দলটি?

বিশ্লেষকদের মতে, দলটির দ্রুত উত্থানের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ ছিলÑ

# দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের জনপ্রিয়তা

# প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের অসন্তোষ

# অরবিন্দ কেজরিওয়ালের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি

# স্বেচ্ছাসেবকনির্ভর আধুনিক প্রচারণা

# শহুরে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের সমর্থন

ভারতের রাজনীতিতে আম আদমি পার্টির উত্থান এখনও নতুন রাজনৈতিক শক্তির দ্রুত সফল হওয়ার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

জিইআরবি, বুলগেরিয়া

স্থানীয় জনপ্রিয়তা থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়

ইউরোপের দেশ বুলগেরিয়ার রাজনীতিতে ২০০৯ সালের নির্বাচন ছিল বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা। দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল। ঠিক সেই সময় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে নতুন রাজনৈতিক দল ‘জিইআরবি’। দলটি গঠনের মাত্র তিন বছরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। আর এর নেতৃত্বে ছিলেন বুলগেরিয়ার সাবেক দমকল কর্মকর্তা ও জনপ্রিয় মেয়র বয়কো বরিসভ।

নতুন দলের জন্ম : জিইআরবি দলটি গঠিত হয় ২০০৬ সালে। দলটির পূর্ণ নামের অর্থ দাঁড়ায়Ñ ‘বুলগেরিয়ার ইউরোপীয় উন্নয়নের নাগরিকরা’। দলটির প্রতিষ্ঠাতা বয়কো বরিসভ তখন রাজধানী সোফিয়ার মেয়র হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। অপরাধ দমন, প্রশাসনিক দৃঢ়তা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কারণে তিনি দ্রুত জাতীয় পর্যায়েও পরিচিত মুখে পরিণত হন। দলটি শুরু থেকেই নিজেদের দুর্নীতিবিরোধী ও ইউরোপমুখী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে।

নির্বাচনে বড় সাফল্য : ২০০৯ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে জিইআরবি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে বুলগেরিয়ার বৃহত্তম দলে পরিণত হয়। এরপর বয়কো বরিসভ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট এবং পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের হতাশা নতুন দলটির পক্ষে বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার ও শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিইআরবির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ে।

জনপ্রিয়তার পেছনের কারণ : জিইআরবির প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতিশ্রুতি। বয়কো বরিসভ নিজেকে ‘কঠোর কিন্তু কার্যকর নেতা’ হিসেবে তুলে ধরেন। দলটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও দেয়।

কেন এত দ্রুত সফল হলো দলটি?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিইআরবির দ্রুত উত্থানের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ ছিলÑ

# পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি জন-অসন্তোষ

# দুর্নীতিবিরোধী জনমত

# বয়কো বরিসভের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা

# স্থানীয় সরকারে কাজের অভিজ্ঞতা

# ইউরোপপন্থি রাজনৈতিক অবস্থান

বুলগেরিয়ার রাজনীতিতে জিইআরবির উত্থান এখনও পূর্ব ইউরোপের দ্রুততম রাজনৈতিক সফলতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ফোরৎসা ইতালিয়া, ইতালি

ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য থেকে ক্ষমতায়

ইতালির রাজনীতিতে ১৯৯৪ সাল ছিল এক অস্থির সময়। দুর্নীতি কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক সংকটে দেশের প্রচলিত বড় দলগুলো যখন ভেঙে পড়ছিল, ঠিক সেই সময় নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন ধনকুবের ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব সিলভিও বারলুসকোনি। দলটির নামÑ ফোরৎসা ইতালিয়া। অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, দলটি গঠনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। আর বারলুসকোনি হয়ে ওঠেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী।

সংকটের মধ্যে নতুন দলের আবির্ভাব : ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ইতালিতে ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত শুরু হয়। মানি পুলিতে নামে পরিচিত সেই অভিযানে বহু পুরনো রাজনৈতিক দল ও নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে। ফলে ইতালির প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়তে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতেই ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে ফোরৎসা ইতালিয়া গঠন করেন সিলভিও বারলুসকোনি। দলটির নাম এসেছে ইতালীয় ফুটবল সমর্থকদের জনপ্রিয় স্লোগান থেকে, যার অর্থ প্রায় ‘এগিয়ে চলো ইতালি’। শুরু থেকেই দলটি নিজেদের নতুন, আধুনিক এবং ব্যবসাবান্ধব রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে।

প্রথম নির্বাচনেই সরকার গঠন : দল গঠনের মাত্র কয়েক মাস পরই ১৯৯৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় ফোরৎসা ইতালিয়া। বারলুসকোনি বিভিন্ন ডানপন্থি ও আঞ্চলিক দলের সঙ্গে জোট গঠন করেন। নির্বাচনে সেই জোট জয়ী হয় এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইতালির ইতিহাসে এত দ্রুত কোনো নতুন দলের ক্ষমতায় ওঠা ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা।

ভিন্ন ধরনের প্রচারণা : সিলভিও বারলুসকোনি ছিলেন ইতালির অন্যতম বড় গণমাধ্যম ব্যবসায়ী। ফলে টেলিভিশন ও গণমাধ্যম ব্যবহারে তার দল অন্যদের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল। তিনি নিজেকে সফল ব্যবসায়ী ও ‘ব্যবস্থার বাইরের মানুষ’ হিসেবে তুলে ধরেন। তার প্রচারণায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর কমানো এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব পায়।

কেন এত দ্রুত সফল হলো দলটি?

বিশ্লেষকদের মতে, ফোরৎসা ইতালিয়ার দ্রুত উত্থানের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ ছিলÑ

# দুর্নীতিকাণ্ডে পুরনো দলগুলোর পতন

# রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি

# বারলুসকোনির গণমাধ্যম প্রভাব

# ব্যবসাবান্ধব ও আধুনিক ভাবমূর্তি

# ডানপন্থি জোট গঠনের কৌশল

ইতালির রাজনৈতিক ইতিহাসে ফোরৎসা ইতালিয়ার উত্থান এখনও নতুন রাজনৈতিক শক্তির দ্রুত ক্ষমতায় পৌঁছানোর অন্যতম নাটকীয় উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।

আপডেট : ১০:৩১:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

এসেই বাজিমাত করেছেন যারা

আপডেট : ১০:৩১:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
১৫

আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
নতুন রাজনৈতিক দল মানেই এখন আর দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস বা প্রজন্মের পর প্রজন্মের সংগঠন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে নতুন মুখ, নতুন বার্তা আর জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে অল্প সময়েই ক্ষমতার কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে কিছু দল। নিচের সাতটি উদাহরণ সেই দ্রুত উত্থানেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপ, যেখানে প্রচলিত রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন রাজনৈতিক দল জায়গা করে নিয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায়। ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেনÑ আজহারুল ইসলাম অভি

তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম, ভারত

তারকা থেকে রাজনৈতিক মঞ্চে

ভারতের তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য ছিল বড় দুটি রাজনৈতিক শিবিরের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে নতুন একটি শক্তি দ্রুত আলোচনায় আসেÑ তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে)। জনপ্রিয় অভিনেতা ও তারকা নেতা থালাপতি বিজয় এই দলটি গঠন করেন। দলটি গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই তামিল রাজনীতিতে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনার জন্ম দেয়, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে।

দলের জন্ম ও পটভূমি : ২০২৪ সালে অভিনেতা বিজয় আনুষ্ঠানিকভাবে তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন। দীর্ঘদিন ধরে তামিল চলচ্চিত্রজগতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা বিজয় ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বার্তা ও জনকল্যাণমূলক অবস্থান নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। দলটির মূল লক্ষ্য হিসেবে তিনি তুলে ধরেন স্বচ্ছ প্রশাসন, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ।

রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ : দল গঠনের পর থেকেই তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। দলটি গত রবিবার রাজ্য সরকার গঠন করে, তবে জনসমর্থন ও জনসমাবেশের মাধ্যমে দ্রুত একটি শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করেছে। বিজয়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে। চলচ্চিত্রজগতের বিশাল ভক্তগোষ্ঠী রাজনৈতিক ময়দানে তাদের প্রভাব ফেলছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

প্রচারণার নতুন ধারা : তামিলাগা ভেত্রি কাজাগামের প্রচারণা প্রচলিত রাজনৈতিক দলের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। বড় সমাবেশ, ডিজিটাল মাধ্যম এবং সরাসরি জনসংযোগের মাধ্যমে দলটি তরুণদের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে। দলটি নিজেদের প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে এবং ‘নতুন রাজনীতি’র ধারণাকে সামনে আনছে।

কেন আলোচনায় এসেছে দলটি?

বিশ্লেষকদের মতে, টিভিকের দ্রুত আলোচনায় আসার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছেÑ

# বিজয়ের ব্যাপক চলচ্চিত্র জনপ্রিয়তা

# তরুণ ভোটারদের মধ্যে নতুন নেতৃত্বের আকাক্সক্ষা

# প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থার সংকট

# সামাজিক মাধ্যমে শক্তিশালী উপস্থিতি

‘পরিবর্তনের রাজনীতি’র বার্তা : তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে টিভিকে এখনও নতুন শক্তি, তবে এটি ভবিষ্যতে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি, নেপাল

নতুন রাজনীতি ও বালেন্দ্র শাহ

নেপালের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত নতুন শক্তিগুলোর একটি হলো রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতি পুরনো কয়েকটি দলের আধিপত্যে সীমাবদ্ধ ছিল। দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নেতৃত্ব সংকটে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক হতাশা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতেই দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে নতুন রাজনৈতিক শক্তিটি।

দলের জন্ম ও দ্রুত উত্থান : ২০২২ সালের জুন মাসে সাংবাদিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব রবি লামিছানে এই দল গঠন করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও টেলিভিশন উপস্থাপনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন। দলটির মূল লক্ষ্য ছিল পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে স্বচ্ছতা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

নির্বাচনে চমক : দল গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই ২০২২ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। নবগঠিত দল হওয়া সত্ত্বেও তারা প্রতিনিধি পরিষদে ২০টি আসন জিতে চতুর্থ বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। এই ফলাফল নেপালের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

বালেন্দ্র শাহের প্রভাব : একই সময় নেপালের স্থানীয় রাজনীতিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন আসেÑ কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহের জয়। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নতুন রাজনৈতিক ঢেউ তৈরি করে। বিশ্লেষকদের মতে, বালেন্দ্র শাহ পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত হলে দলটির গ্রহণযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে। এই সমন্বয়ের পর দলটি জাতীয় রাজনীতিতে আরও শক্ত অবস্থানে পৌঁছায় এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে।

প্রচারণার ধরন ও জনসমর্থন : রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির প্রচারণা ছিল প্রচলিত দলের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক ও জনমুখী। সামাজিক মাধ্যম, সরাসরি জনসংযোগ এবং ‘পুরনো রাজনীতির বিকল্প’ এই বার্তা তাদের দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে দলটির গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

কেন এত দ্রুত সফল হলো দলটি?

বিশ্লেষকদের মতে, দলটির এই দ্রুত উত্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ ছিলÑ

# পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জন-অসন্তোষ

# দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অকার্যকারিতা

# রবি লামিছানের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা

# বালেন্দ্র শাহের রাজনৈতিক প্রভাব ও তরুণদের আকর্ষণ

# সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা

নেপালের রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির উত্থান এখন নতুন প্রজন্মনির্ভর রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল, ইউক্রেন

কাল্পনিক দল থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়

ইউক্রেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১৯ সালকে অনেক বিশ্লেষক ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্পের বছর’ বলে উল্লেখ করেন। কারণ, সে বছর এমন এক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে, যাদের অস্তিত্বের বয়স ছিল মাত্র এক বছরের কিছু বেশি। দলটির নামÑ ‘সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল’ (ঝবৎাধহঃ ড়ভ ঃযব চবড়ঢ়ষব)। আর এই দলের মুখ ছিলেন টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী ভলোদিমির জেলেনস্কি। একসময় যিনি টিভি পর্দায় কাল্পনিক প্রেসিডেন্টের চরিত্রে অভিনয় করতেন, বাস্তবে তিনিই হয়ে ওঠেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। শুধু তাই নয়, তার নতুন রাজনৈতিক দলও পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ইতিহাস গড়ে।

টিভি সিরিজ থেকে রাজনীতির ময়দানে : সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল নামটি প্রথমে ছিল একটি জনপ্রিয় ইউক্রেনীয় টেলিভিশন সিরিজের নাম। সেই সিরিজে জেলেনস্কি অভিনয় করেছিলেন এক সাধারণ স্কুল শিক্ষকের চরিত্রে, যিনি দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্যের কারণে হঠাৎ প্রেসিডেন্ট হয়ে যান। সিরিজটি ইউক্রেনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পরে সেই সিরিজের নামেই রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়। দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৮ সালে নিবন্ধিত হয়।

কয়েক মাসেই জনপ্রিয়তার বিস্ফোরণ : ২০১৮ সালের শেষ দিকে জেলেনস্কি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। তখনও অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। কারণ, তার কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না।

কিন্তু সামাজিক মাধ্যম, টেলিভিশন জনপ্রিয়তা এবং নতুন মুখ হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রচারণায় তিনি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, রাজনৈতিক সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র গঠনের কথা বলেন।

২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পেট্রো পরিশেনকোকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেন। দ্বিতীয় দফার ভোটে জেলেনস্কি প্রায় ৭৩ শতাংশ ভোট পানÑ যা ইউক্রেনের আধুনিক ইতিহাসে অন্যতম বড় বিজয়।

পার্লামেন্টেও একচ্ছত্র জয় : প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরই জেলেনস্কি পার্লামেন্ট ভেঙে আগাম নির্বাচনের ডাক দেন। সেই নির্বাচনে তার দল সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল অভাবনীয় সাফল্য পায়। ২০১৯ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে দলটি ৪৩ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে ২৫৪টি আসন জেতে। স্বাধীন ইউক্রেনের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো একক দল পার্লামেন্টে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিলÑ দলটির অধিকাংশ প্রার্থীই ছিলেন রাজনৈতিকভাবে একেবারে নতুন মুখ। অনেকেই এসেছিলেন ব্যবসা, আইটি, গণমাধ্যম কিংবা সিভিল সোসাইটি থেকে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বড় অংশের আগে কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাই ছিল না।

কেন এত দ্রুত সফল হলো দলটি?

বিশ্লেষকদের মতে, ‘ঝবৎাধহঃ ড়ভ ঃযব চবড়ঢ়ষব’-এর সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ ছিলÑ

# পুরনো রাজনৈতিক শ্রেণির প্রতি জনবিরক্তি

# দুর্নীতিবিরোধী শক্তিশালী জনমত

# জেলেনস্কির টেলিভিশন জনপ্রিয়তা

# সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক আধুনিক প্রচারণা

# তরুণ ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন

# সাধারণ মানুষের দল হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন

লা রিপুবলিক অঁ মার্শ, ফ্রান্স

এক বছরের মধ্যেই এলিসি প্রাসাদে

ফ্রান্সের রাজনীতিতে ২০১৭ সাল ছিল এক বিস্ময়ের বছর। বহু দশক ধরে দেশটির ক্ষমতা ঘুরে ফিরছিল মূলত সমাজতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল দুই রাজনৈতিক ধারার মধ্যে। ঠিক সেই সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে আবির্ভূত হয় এক নতুন দলÑ লা রিপুবলিক অঁ মার্শ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দলটি শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই জয় পায়নি, ফরাসি পার্লামেন্টেও বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দলের প্রতিষ্ঠাতা ইমানুয়েল ম্যাখোঁ তখন মাত্র ৩৯ বছর বয়সী। তিনি হয়ে ওঠেন ফ্রান্সের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী প্রেসিডেন্ট।

নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান : ২০১৬ সালের এপ্রিলে ইমানুয়েল ম্যাখোঁ নতুন রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে লা রিপুবলিক অঁ মার্শ গঠন করেন। তখন তিনি ফ্রান্স সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের হতাশা এবং পুরনো নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজেকে ‘ডান-বাম বিভাজনের বাইরে’ এক নতুন মুখ হিসেবে তুলে ধরেন। দলটির নামের অর্থ দাঁড়ায়Ñ ‘প্রজাতন্ত্র এগিয়ে চলেছে’। শুরু থেকেই দলটি তরুণ ভোটার, মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং পরিবর্তনকামী জনগণের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে থাকে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চমক : ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাখোঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কট্টর ডানপন্থি নেতা মারিন ল্য পেন। নির্বাচনী প্রচারণায় ম্যাখোঁ ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে অবস্থান, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আধুনিক উদারনীতির কথা বলেন। নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় তিনি প্রায় ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফরাসি রাজনীতিতে এটি ছিল দীর্ঘদিনের প্রচলিত দলীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে বড় ধরনের জনরায়।

পার্লামেন্টেও শক্ত অবস্থান : প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে লা রিপুবলিক অঁ মার্শ এবং তাদের মিত্ররা জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিলÑ দলটির অনেক প্রার্থীই ছিলেন রাজনীতিতে নতুন। কেউ এসেছিলেন ব্যবসা থেকে, কেউ শিক্ষকতা বা সামাজিক কাজ থেকে। প্রচলিত রাজনৈতিক পরিবারের বাইরে থেকেও তারা নির্বাচনে জয় পান।

কেন এত দ্রুত সফল হলো দলটি?

বিশ্লেষকদের মতে, দলটির দ্রুত সাফল্যের পেছনে কয়েকটি কারণ ছিলÑ

# পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের বিরক্তি

# নতুন ও তরুণ নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ

# ম্যাখোঁর মধ্যপন্থি অবস্থান

# আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণা

# ইউরোপপন্থি ও সংস্কারমুখী বার্তা

ফরাসি রাজনীতিতে লা রিপুবলিক অঁ মার্শ-এর উত্থান এখনও আধুনিক ইউরোপের দ্রুততম রাজনৈতিক সাফল্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

আম আদমি পার্টি, ভারত

আন্দোলন থেকে দিল্লির মসনদ

ভারতের রাজনীতিতে ২০১৩ সাল ছিল এক অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের বছর। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী দিল্লির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছিল কংগ্রেস ও বিজেপির মতো বড় দলগুলো। ঠিক সেই সময় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ভেতর থেকে উঠে আসে নতুন একটি রাজনৈতিক দলÑ আম আদমি পার্টি। মাত্র এক বছরের মধ্যে দলটি দিল্লির নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।

আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক দলে : ২০১১ সালে ভারতে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ব্যাপক গতি পায়। সমাজকর্মী আন্না হাজারের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। পরবর্তীতে আন্দোলনের একটি অংশ মনে করে, শুধু আন্দোলন করে নয়, সরাসরি রাজনীতিতে এসেই পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই ২০১২ সালের নভেম্বরে গঠিত হয় আম আদমি পার্টি।

দলটির নামের অর্থÑ ‘সাধারণ মানুষের দল’। শুরু থেকেই তারা নিজেদের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকল্প হিসেবে তুলে ধরে। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল দলটির প্রধান বার্তা।

প্রথম নির্বাচনেই চমক : দল গঠনের এক বছরের মধ্যেই ২০১৩ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেয় আম আদমি পার্টি। তখন অনেকেই দলটিকে গুরুত্ব দেননি। কারণ, তাদের সাংগঠনিক শক্তি সীমিত ছিল এবং অধিকাংশ প্রার্থীই ছিলেন নতুন মুখ। কিন্তু নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, দলটি ৭০টির মধ্যে ২৮টি আসনে জয় পেয়েছে। কংগ্রেসকে বড় ধাক্কা দিয়ে তারা দিল্লির দ্বিতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়। পরবর্তীতে কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন করেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তিনি প্রথমবারের মতো দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হন।

নতুন ধরনের প্রচারণা : আম আদমি পার্টির প্রচারণা ছিল প্রচলিত ভারতীয় রাজনীতির তুলনায় ভিন্ন। বড় বড় সমাবেশের পাশাপাশি তারা ঘরে ঘরে প্রচারণা চালায়। সামাজিক মাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবকভিত্তিক প্রচার এবং ছোট অনুদানের মাধ্যমে দলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। দলের সাধারণ প্রতীক, সাধারণ পোশাক এবং ‘সাধারণ মানুষের রাজনীতি’ ধারণা তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিশেষ প্রভাব ফেলে।

কেন এত দ্রুত সফল হলো দলটি?

বিশ্লেষকদের মতে, দলটির দ্রুত উত্থানের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ ছিলÑ

# দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের জনপ্রিয়তা

# প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের অসন্তোষ

# অরবিন্দ কেজরিওয়ালের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি

# স্বেচ্ছাসেবকনির্ভর আধুনিক প্রচারণা

# শহুরে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের সমর্থন

ভারতের রাজনীতিতে আম আদমি পার্টির উত্থান এখনও নতুন রাজনৈতিক শক্তির দ্রুত সফল হওয়ার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

জিইআরবি, বুলগেরিয়া

স্থানীয় জনপ্রিয়তা থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়

ইউরোপের দেশ বুলগেরিয়ার রাজনীতিতে ২০০৯ সালের নির্বাচন ছিল বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা। দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল। ঠিক সেই সময় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে নতুন রাজনৈতিক দল ‘জিইআরবি’। দলটি গঠনের মাত্র তিন বছরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। আর এর নেতৃত্বে ছিলেন বুলগেরিয়ার সাবেক দমকল কর্মকর্তা ও জনপ্রিয় মেয়র বয়কো বরিসভ।

নতুন দলের জন্ম : জিইআরবি দলটি গঠিত হয় ২০০৬ সালে। দলটির পূর্ণ নামের অর্থ দাঁড়ায়Ñ ‘বুলগেরিয়ার ইউরোপীয় উন্নয়নের নাগরিকরা’। দলটির প্রতিষ্ঠাতা বয়কো বরিসভ তখন রাজধানী সোফিয়ার মেয়র হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। অপরাধ দমন, প্রশাসনিক দৃঢ়তা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কারণে তিনি দ্রুত জাতীয় পর্যায়েও পরিচিত মুখে পরিণত হন। দলটি শুরু থেকেই নিজেদের দুর্নীতিবিরোধী ও ইউরোপমুখী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে।

নির্বাচনে বড় সাফল্য : ২০০৯ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে জিইআরবি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে বুলগেরিয়ার বৃহত্তম দলে পরিণত হয়। এরপর বয়কো বরিসভ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট এবং পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের হতাশা নতুন দলটির পক্ষে বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার ও শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিইআরবির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ে।

জনপ্রিয়তার পেছনের কারণ : জিইআরবির প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতিশ্রুতি। বয়কো বরিসভ নিজেকে ‘কঠোর কিন্তু কার্যকর নেতা’ হিসেবে তুলে ধরেন। দলটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও দেয়।

কেন এত দ্রুত সফল হলো দলটি?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিইআরবির দ্রুত উত্থানের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ ছিলÑ

# পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি জন-অসন্তোষ

# দুর্নীতিবিরোধী জনমত

# বয়কো বরিসভের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা

# স্থানীয় সরকারে কাজের অভিজ্ঞতা

# ইউরোপপন্থি রাজনৈতিক অবস্থান

বুলগেরিয়ার রাজনীতিতে জিইআরবির উত্থান এখনও পূর্ব ইউরোপের দ্রুততম রাজনৈতিক সফলতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ফোরৎসা ইতালিয়া, ইতালি

ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য থেকে ক্ষমতায়

ইতালির রাজনীতিতে ১৯৯৪ সাল ছিল এক অস্থির সময়। দুর্নীতি কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক সংকটে দেশের প্রচলিত বড় দলগুলো যখন ভেঙে পড়ছিল, ঠিক সেই সময় নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন ধনকুবের ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব সিলভিও বারলুসকোনি। দলটির নামÑ ফোরৎসা ইতালিয়া। অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, দলটি গঠনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। আর বারলুসকোনি হয়ে ওঠেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী।

সংকটের মধ্যে নতুন দলের আবির্ভাব : ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ইতালিতে ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত শুরু হয়। মানি পুলিতে নামে পরিচিত সেই অভিযানে বহু পুরনো রাজনৈতিক দল ও নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে। ফলে ইতালির প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়তে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতেই ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে ফোরৎসা ইতালিয়া গঠন করেন সিলভিও বারলুসকোনি। দলটির নাম এসেছে ইতালীয় ফুটবল সমর্থকদের জনপ্রিয় স্লোগান থেকে, যার অর্থ প্রায় ‘এগিয়ে চলো ইতালি’। শুরু থেকেই দলটি নিজেদের নতুন, আধুনিক এবং ব্যবসাবান্ধব রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে।

প্রথম নির্বাচনেই সরকার গঠন : দল গঠনের মাত্র কয়েক মাস পরই ১৯৯৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় ফোরৎসা ইতালিয়া। বারলুসকোনি বিভিন্ন ডানপন্থি ও আঞ্চলিক দলের সঙ্গে জোট গঠন করেন। নির্বাচনে সেই জোট জয়ী হয় এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইতালির ইতিহাসে এত দ্রুত কোনো নতুন দলের ক্ষমতায় ওঠা ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা।

ভিন্ন ধরনের প্রচারণা : সিলভিও বারলুসকোনি ছিলেন ইতালির অন্যতম বড় গণমাধ্যম ব্যবসায়ী। ফলে টেলিভিশন ও গণমাধ্যম ব্যবহারে তার দল অন্যদের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল। তিনি নিজেকে সফল ব্যবসায়ী ও ‘ব্যবস্থার বাইরের মানুষ’ হিসেবে তুলে ধরেন। তার প্রচারণায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর কমানো এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব পায়।

কেন এত দ্রুত সফল হলো দলটি?

বিশ্লেষকদের মতে, ফোরৎসা ইতালিয়ার দ্রুত উত্থানের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ ছিলÑ

# দুর্নীতিকাণ্ডে পুরনো দলগুলোর পতন

# রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি

# বারলুসকোনির গণমাধ্যম প্রভাব

# ব্যবসাবান্ধব ও আধুনিক ভাবমূর্তি

# ডানপন্থি জোট গঠনের কৌশল

ইতালির রাজনৈতিক ইতিহাসে ফোরৎসা ইতালিয়ার উত্থান এখনও নতুন রাজনৈতিক শক্তির দ্রুত ক্ষমতায় পৌঁছানোর অন্যতম নাটকীয় উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।