গাজাগামী ফ্লোটিলা নৌযান মিকেনো ইসরায়েলির হাতে আটক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
গাজা উপকূলে প্রবেশ করার পরই ইসরায়েলি নৌবাহিনী আটক করেছে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র অন্যতম জাহাজ ‘মিকেনো’কে। এটি ছিল ফ্লোটিলার প্রথম জাহাজ যা অবরুদ্ধ গাজার জলসীমায় পৌঁছায়। বিশ্বজুড়ে এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন দেশের নেতারা।
‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ নামের মানবিক ত্রাণবাহী বহরের অংশ হিসেবে ‘মিকেনো’ নামের জাহাজটি গাজার আঞ্চলিক জলসীমায় প্রবেশ করার পরপরই ইসরায়েলি বাহিনী সেটি আটক করে। জাহাজটিতে থাকা সমস্ত মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেপ্তার করে আশদোদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে — জানিয়েছে তুরস্ক ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইয়েনি সাফাক।
এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোনো ফ্লোটিলা জাহাজ অবরুদ্ধ গাজার উপকূলে পৌঁছায়, যদিও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
ইসরায়েল আগেই ঘোষণা দিয়েছিল যে, গাজামুখী যেকোনো ত্রাণবহরকে তারা থামাতে বদ্ধপরিকর। তাদের দাবি, এই স্বেচ্ছাসেবীরা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থীভাবে ‘নৌ অবরোধ ভাঙার’ চেষ্টা করছেন।
বুধবার রাতে গাজার উপকূল থেকে প্রায় ১৩০ কিমি দূরে, ফ্লোটিলার অন্তত ১৩টি জাহাজে অভিযান চালায় ইসরায়েলি নৌবাহিনী। এতে ৪০টির বেশি জাহাজ ও প্রায় ৫০০ কর্মীর অংশগ্রহণে গঠিত ত্রাণবহরটির বড় অংশ থমকে যায়।
ফ্লোটিলা সংগঠকদের দাবি, অভিযান শুরুর আগে ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে জাহাজগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং সিগন্যাল জ্যাম করে যাতে তারা বিপদসংকেত পাঠাতে না পারে।
আটক হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আলমা’, ‘সিরিয়াস’, ‘আদারা’ প্রভৃতি, যেগুলো আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছিল বলে দাবি করেছে ফ্লোটিলা কর্তৃপক্ষ।
আটক ২০১ জন কর্মী ৩৭টি দেশের নাগরিক। শুধু স্পেনেরই ৩০ জন, ইতালির ২২ জন, তুরস্কের ২১ জন এবং মালয়েশিয়ার ১২ জন কর্মী রয়েছেন।
সংগঠকদের দাবি, এখনও প্রায় ৩০টি নৌযান গাজার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা ইসরায়েলি বাধা উপেক্ষা করেই ত্রাণ পৌঁছে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
ইসরায়েলের এই অভিযানের বিরুদ্ধে ইতালি, আর্জেন্টিনা ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়েছে।
বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া:
মালয়েশিয়া: প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, “ইসরায়েলের দমননীতিকে আমরা ঘৃণা করি।”
আয়ারল্যান্ড: পররাষ্ট্রমন্ত্রী সায়মন হ্যারিস একে “উদ্বেগজনক” বলে মন্তব্য করেন।
কলম্বিয়া: প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো ইসরায়েলের কূটনীতিকদের বহিষ্কার করেছেন এবং বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করেছেন।
ভেনেজুয়েলা: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল বলেন, “এটি গণহত্যার অংশ হিসেবে খাদ্য সরবরাহ বন্ধের চেষ্টা।”
তুরস্ক: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে “সরাসরি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড” বলে আখ্যা দিয়েছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সুইডিশ জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ জাহাজের ডেকে বসে আছেন, চারপাশে ইসরায়েলি সেনারা। তার উপস্থিতি বিশ্ব গণমাধ্যমে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ আগস্টের শেষ দিকে স্পেন ও ইতালি থেকে যাত্রা শুরু করে। গ্রিস ও তিউনিসিয়া হয়ে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে পৌঁছায়। যাত্রাপথে কিছু জাহাজ ড্রোন হামলা ও অজানা নৌযানের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যাত্রার সময় বহু আন্তর্জাতিক কর্মী অংশগ্রহণ করেন — আমেরিকার ২৪ জনের মধ্যে প্রাক্তন সেনা সদস্যও রয়েছেন। ইতালি ও স্পেনের নৌবাহিনী এই ফ্লোটিলার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে, যদিও সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি।
২০০৭ সালে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই ইসরায়েল সেখানে কঠোর অবরোধ চালিয়ে আসছে। খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও মানবিক সহায়তা প্রবেশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ‘মানবিক বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছে।
‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ বিশ্ব বিবেকের একটি প্রতিবিম্ব — যেখানে ৪৪টি দেশের মানুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, একত্র হয়েছিল অবরুদ্ধ মানুষের পাশে দাঁড়াতে। কিন্তু মানবিক ত্রাণের এই শান্তিপূর্ণ যাত্রাকে সামরিক অভিযানে থামিয়ে দেওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে — গাজার মানুষ কি আরব্ধ থাকবে বিশ্ব বিবেকের চোখের আড়ালে?
























