ভুলে ভরা মামলার এজাহার

অনলাইন ডেস্ক।।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের মধ্য দুপুর। রাজধানীর মিরপুরে ছাত্র-জনতার মিছিলে শামিল হয়েছিলেন মুদি দোকানদার মহিউদ্দিন। খুনিদের ঘাতক বুলেট তার বুকের বাম পাশ ফুঁড়ে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। থেমে যায় স্লোগান, মহিউদ্দিন লুটিয়ে পড়েন রাজপথে। চার দিন পর শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান তিনি। এ হত্যাকাণ্ডে মিরপুর থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে। এতে সাক্ষী করা হয়েছে নিহতের বাবা আব্দুল হাশেমকে, যিনি ১২ বছর আগেই মারা গেছেন। মামলার আসামি করা হয়েছে বিসিএস ২০ ব্যাচের পুলিশ কর্মকর্তা মহিউদ্দিন ফারুকীকে। পুলিশের এ কর্মকর্তার নামের পাশে লেখা আওয়ামী লীগ নেতা। শুধু মহিউদ্দিন হত্যা মামলাতেই নয়, জুলাই হত্যাকাণ্ডের অনেক মামলার এজাহারই ভুলে ভরা।
মহিউদ্দিন হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. আলমগীর হোসেন গতকাল আমাদের সময়কে জানান, মামলার বাদী মোহাম্মদ আলী (৭২) নিহত মহিউদ্দিনকে চেনেন না। তার বাবাকেও চেনেন না। তিনি মামলায় সাক্ষী করেছেন নিহতের বাবাকে, যিনি অনেক আগেই মারা গেছেন। উপরন্তু মামলার বাদী মোহাম্মদ আলীও গত নভেম্বরে মারা গেছেন।
মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে এই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, হত্যার ঘটনার সরাসরি কোনো ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনার দিন যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি চালাচ্ছে, সেই ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। লাশের ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল করা হয়নি। তবে ভুক্তভোগী যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, সেই সময়কার চিকিৎসকের সার্টিফিকেট আছে। মামলার ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে, বলেন তিনি।
গত বছরের ৫ আগস্ট অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় তৎকালীন সরকার পতনের মিছিলে গিয়ে হযরত বিল্লাল হোসেন (২০) মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তিনি ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন। ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাকে দাফন করা হয়। তবে মামলার এফআইআরে উল্লেখ করা হয়েছে, বিল্লালের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আসামিদের কার বিরুদ্ধে কী দায়, সেটার উল্লেখ নেই এফআইআরে। সাক্ষীদের সুনির্দিষ্ট ঠিকানাও নেই। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিমকোর্টের
আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, মামলার গোড়াতেই গলদ হয়ে গেছে। মামলাগুলো এত বেশি ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে, দোষী ব্যক্তিকে শাস্তি নিশ্চিত করা খুবই দুরূহ। একেকটি খুনে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলার সঠিক তদন্ত করতে গেলে পাঁচ বছরেও অন্য মামলার তদন্ত করতে পারবে না। আওয়ামী লীগের সময় এমন চর্চা ছিল যে, একটা মামলায় ২০০ জনকে জড়িয়ে তাদের হয়রানি করা। আরেকটা হলো পুলিশের কিছু কামাই হবে, উকিলদেরও কামাই হবে। এসব করে করে বিচার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। এগুলোর ফলাফল খুবই অনিশ্চিত। এজাহারগুলো যেভাবে হয়েছে, তাতে করে আইন অনুযায়ী বিচার করে শাস্তি দিতে বহু বছর লেগে যাবে। এখন সবাইকে চিন্তাভাবনা করে সমাধান বের করতে হবে।
সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, ৫ আগস্টের আগের (জুলাই গণহত্যা) মামলা দিয়ে কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। মামলাগুলো সঠিকভাবে এবং শক্তভাবে করা হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর স্বজন নন, ভাড়াটে লোকজন মামলা করেছেন। মামলাগুলো কোনো এক জায়গায় ড্রাফট হয়েছে এরপর সেগুলো কপি-পেস্ট হয়েছে। সব জায়গায় প্রায় একই লেখা। কিছু নাম শুধু বদল হয়েছে। এগুলো দিয়ে মামলা প্রমাণ করা যাবে না। যারা আসলে মারা গেলেন, তাদের বিচার হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
এখন সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার উপায় কী- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাদী আসামিদের না চিনলে বিচার কীভাবে হবে? সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে এখন সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা যেতে পারে যে, সব মামলা বাতিল হবে। এরপর ভুক্তভোগীর আত্মীয়স্বজনরা মামলা করবে। সঠিক ঘটনা উল্লেখ করে করতে হবে। মামলা হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করবে।
মনগড়া সময় ও স্থান: মামলার এজাহারের সঙ্গে কিছু হত্যাকাণ্ডের স্থান-কালের মিল নেই। মনগড়া সময় ও স্থান বসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঢাকার মিরপুর থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতি থানার আশরাফুল ইসলাম ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। জুলাই আন্দোলনের সময় মিরপুর মডেল থানার পাশে বুকে গুলি লেগে তিনি মারা যান। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আসামিরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালালে ভিকটিমের বুকের পেছনে গুলি লাগে। এজাহারে উল্লিখিত ঘটনার সময় উল্লেখ করা হয়েছে- ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টায়। কিন্তু তদন্তে পাওয়া যায়, ৪ আগস্ট নয়, পরদিন বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজধানীর বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ^বিদ্যালয়ের সামনের সড়কে ছাত্রজনতার ওপর চালানো এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হন শরীয়তপুরের যুবক আল-আমিন। এ হত্যায় মামলা করেন তার চাচা রহমান মাল। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, রাত সাড়ে ৯টায় রাজধানীর ভাটারা থানাধীন ১০০ ফিট রাস্তায় বিজয় উল্লাস ও আনন্দ মিছিল করার সময় গুলি করে আল-আমিনকে হত্যা করা হয়। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এজাহারে নিহতের বাসা হাতিরঝিল এলাকায় উল্লেখ করা হলেও তার বাসা বাড্ডার দক্ষিণ আনন্দনগর এলাকায়। হত্যাকাণ্ডের স্থান ভাটারা এলাকায় উল্লেখ করা হলেও তিনি নিহত হন বাড্ডা থানাধীন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে।
বাদী চেনে না ভুক্তভোগী ও সাক্ষীকে: বাড্ডা থানাধীন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মধ্যবর্তী মেরুল বাড্ডার আফতাবনগর এলাকায় ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মিছিল করার সময় গুলিবিদ্ধ হন গোপালগঞ্জ জেলার হাসান শেখের ছেলে ১৭ বছর বয়সী জিল্লুর শেখ। এ ঘটনায় বাদী হয়ে মামলা করেছেন আহাম্মদ হোসেন লিটন নামে এক ব্যক্তি। মামলার এজাহারে উল্লেখিত ফোন নম্বরে বাদীর সঙ্গে গতকাল আমাদের সময়ের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সারাদিনই নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগীর সম্পূর্ণ অপরিচিত বাদী। তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। বাদীকে হাজির হওয়ার জন্য তার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায় একাধিকবার নোটিশ পাঠালেও হাজির হননি। ফোন করা হলেও তিনি রেসপন্স করেন না।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ঢাকার সাইনবোর্ড ফুটওভার ব্রিজের উত্তরপাশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ চলাকালে গুলিতে নিহত হন হাফেজ মো. সাজেদুর রহমান ওমর (২০)। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরের শাহজাহানের ছেলে সাজেদুর ২০১৮ সালে কোরআনে হাফেজ হওয়ার পর ২০২১ সালে কোনাপাড়ার একটি মাদ্রাসা থেকে জেএসসি পাস করেন। মৃত্যুর আগে ভিকটিম কাকরাইলের একটি আইটি ফার্মে কোর্স করছিলেন। তার মাথার পেছনে গুলি লেগে সামনে দিয়ে বের হয়ে গেছে। এ হত্যাকাণ্ডে মামলা দায়ের করেন যশোরের অভয়নগরের আব্দুল গাফফারের ছেলে সৈয়দ তানভীর আহম্মেদ। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাদীকে ভিকটিমের কোনো আত্মীয়স্বজন চেনেনই না। বাদীর সঙ্গে ভিকটিম তথা ভিকটিমের পরিবারের কারও কোনো সম্পর্ক নেই। বাদী তানভীর আহম্মেদ একজন প্রতারক। বিভিন্ন জেলায় অফিস খুলে জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেন মর্মে অভিযোগ আছে। প্রতারণার অভিযোগে আগেও তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। মামলার সময় বাদী তার মোবাইল নম্বর ও ঠিকানাসহ ব্যক্তিগত বিভিন্ন তথ্য ভুল দিয়েছেন। মামলার এজাহারে বাদী ঘটনার স্থান যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ ফুটওভার ব্রিজের নিচে উল্লেখ করলেও হত্যাকাণ্ড ঘটে সাইনবোর্ড ফুটওভার ব্রিজের উত্তরপাশের গলিতে। এজাহারে ঘটনার সময় ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই উল্লেখ করা হলেও সাজেদুর নিহত হয়েছিলেন আরও তিন দিন আগে অর্থাৎ ২১ জুলাই।—আমদেরসময়

























