চুয়াডাঙ্গা ০৫:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পণ্য আমদানিতে বিকল্প দেশের সন্ধানে সরকার

Padma Sangbad
৯২

মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে পিষ্ট সাধারণ মানুষ; সরকারও বিব্রত। টানা আট মাস ধরে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে আছে। গত নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ গত বছরের নভেম্বরে ১০০ টাকায় যে খাদ্য কেনা গেছে, চলতি বছরের নভেম্বরে একই পরিমাণ খাদ্যপণ্য কিনতে প্রয়োজন হচ্ছে ১১৩ টাকা ৮০ পয়সা। এটি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো কাজ করছে না। এর মধ্যে আগস্টের পর দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে অনেক পণ্যের আমদানি বিঘ্নিত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। এ থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে এবং দীর্ঘদিনের এই নির্ভরতা কাটাতে নিত্যপণ্য আমদানিতে বিকল্প দেশের সন্ধান করছে সরকার। একক উৎস-দেশের ওপর নির্ভরতা কাটাতে বিকল্প দেশ খোঁজার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও (বিটিটিসি)। ইতোমধ্যে বিটিটিসি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। সেখানে ভারতের পাশাপাশি আরও কিছু দেশ চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আলু-পেঁয়াজের দাম ও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে বিকল্প উৎসের সন্ধান দিয়েছে বিটিটিসি। বিটিটিসির এ প্রস্তাবনার ধারাবাহিতকায় বিকল্প দেশ থেকে এসব পণ্য আমদানিতে আমদানিকারকদের মনোযোগী হওয়ার কথা জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও মনে করেন, যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা থাকলে নিত্যপণ্যের চাহিদা পূরণে বিকল্প দেশ থেকে আমদানি করে দেশের সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ধরে রাখা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও বাজার পর্যবেক্ষণ থাকলে খরচও কমিয়ে আনা যাবে।

জানা গেছে, বর্তমানে ভারত ও মিয়ানমার এ দুই দেশ থেকে পেঁয়াজ বেশি আমদানি হচ্ছে। পাশাপাশি স্বল্প পরিসরে পাকিস্তান, চীন ও তুরস্ক থেকেও আমদানি হচ্ছে। আর আলু আমদানি হচ্ছে শুধু ভারত থেকে। এক্ষেত্রে আলু আমদানিতে জার্মান, মিশর, চীন ও স্পেনের কথা বলা হয়েছে বিটিটিসির প্রতিবেদনে। আর চীন, পাকিস্তান ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানির কথা বলা হয়েছে।

বিটিটিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরে বাংলাদেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৬ থেকে ২৮ লাখ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ৩৯ লাখ টন। তবে ৩০ শতাংশ সংরক্ষণকালীন ক্ষতি ও বীজ বাদে সরবরাহ হয়েছে ২৭ লাখ টনের কিছু বেশি। যদিও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, উৎপাদন ও চাহিদার হিসাব ঠিক নেই। এ কারণে দেশে ভালো উৎপাদনের পরও চাহিদার অন্তত ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর, চীন ও মিয়ানমার থেকে সাড়ে ৯ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।

আলুর বিষয়ে বলা হয়েছে, দেশে বছরে আলুর চাহিদা ৮৫ থেকে ৯০ লাখ টন। স্থানীয় উৎপাদন ১০৬ লাখ টন। ২৫ শতাংশ সংরক্ষণকালীন ক্ষতি ও বীজ বাদে সরবরাহ সাড়ে ৭৯ লাখ টন। ভারত থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আলু আমদানি হয়েছে দেড় লাখ টন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন আমাদের সময়কে বলেন, জিনিসপত্রের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের কষ্টের বিষয়ে সরকার অবগত। দাম কমানোর ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ চেষ্টা বহাল আছে। এ পর্যন্ত নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে ইতোমধ্যে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তাদের স্বস্তি আসতে শুরু করেছে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও পরিমাণ আরও বাড়ানো গেলে দ্রুত দ্রব্যমূল্যে স্থিতিশীলতা আসবে। তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে কিছু তাৎক্ষণিক ও কিছু দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দাম বেড়ে যাওয়ার পর আমরা টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে আলু বিক্রি শুরু করেছি। পাশাপাশি আলু আমদানির অনুমোদনও দেওয়া আছে। এসব তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ। অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহযোগিতায় খেজুর, চিনি, সয়াবিন তেল, ডিমসহ আরও কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমানো হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হবে, এটা মেনে নিয়েই শুধু পণ্যমূল্যের স্থিতিশীলতা আনতে এসব শুল্ক কমানো হয়েছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চাহিদা-জোগানের ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশকে উদার ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয় বাজারে যে সিন্ডিকেটের কথা বলা হয়, এখন দেশের ক্ষেত্রে (পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে) সিন্ডিকেট হলেও সমস্যা। অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক নয়। বাংলাদেশের জন্য ভারত, পাকিস্তান বা চীন কোনো ইস্যু নয়; বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবাইকে আমরা সংযুক্ত করতে চাই।

দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে পার্শ¦বর্তী দেশ ভারত থেকে প্রতিবছর পেঁয়াজ, চাল, ডাল, কাঁচামরিচ, আদা ও মসলাসহ অনেক ধরনের নিত্যপণ্য আমদানি হয়। অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে দেশটির ওপর নির্ভরতা অনেকখানি বেড়েছে। এ ছাড়া নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট একটি বা দুটি দেশের ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে। ফলে সেসব দেশে রপ্তানি কড়াকড়ি হলে কিংবা নিষেধাজ্ঞা দিলে দেশের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। তাই কোনো পণ্যের আমদানির জন্য কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প উৎসের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

বর্তমানে পেঁয়াজ ও আলুর বাজার সামাল দিতে সরকার শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। এরপরও আমদানি বাড়ছে না। খরচ বেড়ে যাওয়া এবং পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নানা প্রতিকূলতায় ভারত থেকে পণ্য আমদানি বিঘ্নিত হচ্ছে। অপরদিকে বিকল্প উৎস দেশগুলো থেকে স্বল্প পরিমাণে আমদানি হওয়ায় দেশের বাজারে সরবরাহ কাক্সিক্ষত পর্যায়ে বাড়ছে না। ফলে বাজারে স্বস্তি ফেরাতে সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে। এর মধ্যে আসন্ন রমজানে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তাই ভারতের পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলেছেন, পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়ায় সময় ও খরচ দুটোই কম লাগায় ভারত, মিয়ানমার থেকে পণ্য আমদানিতে বেশি ঝোঁক আমদানিকারকদের। অপরদিকে অন্য উৎস দেশগুলো থেকে আমদানির সম্ভাবনা থাকলেও সেদিকে নজর কম। কিন্তু সরকার মনোযোগ দিলে একটি-দুটি দেশের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে অন্য দেশগুলো থেকে আমদানি করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব। পেঁয়াজের জন্য চীন, মিশর, পাকিস্তান, তুরস্ক; চালের জন্য ভিয়েতনাম, লাওস, মিয়ানমার; ডালের জন্য অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক; আলুর জন্য হল্যান্ড, পোল্যান্ড; মসলার জন্য সিরিয়া, ইরান, ইন্দোনেশিয়া; আদার জন্য থাইল্যান্ড, চীন; গমের জন্য রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা- এসব উৎস দেশগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে রয়েছে ভোগ্যপণ্যের বড় পাইকারি কেন্দ্র। ভোজ্যতেল, চিনি, আটা-ময়দা ও মসলাসহ সব ধরনের নিত্যপণ্য এই বাজার থেকেই সংগ্রহ করেন রাজধানীসহ আশপাশের এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীরা।

কথা হলে মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা আমাদের সময়কে বলেন, নিকটবর্তী দেশ হওয়ায় ভারত কিংবা মিয়ানমার থেকে আমদানি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন আমাদের আমদানিকারকরা। কিন্তু বিকল্প উৎস দেশগুলোর দিকে নজর কম। এতে একটি বা দুটি দেশের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। আমদানিতে ভারতের ওপর যতটা না আমরা নির্ভরশীল, তার থেকেও বেশি নির্ভরশীল করে রাখা হয়েছে আমাদের। আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে বলে এসেছি, বিকল্প উৎস দেশ থেকে আমদানিতে গুরুত্ব দিতে। কিন্তু সময় বেশি লাগবে, খরচ বেশি বলা হয়েছে। আমরা বলেছি, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বিশ্ববাজারে এখন প্রতিযোগিতা বেড়েছে। আসন্ন রমজানে পণ্যবাজার নিয়ে তিনি বলেন, সরকার আসে সরকার যায়। কিন্তু আমাদের পরামর্শ কেউই শোনে না। রোজার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয় না। ফলে রমজান এলেই বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এবার রমজানের আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টার কোনো বৈঠক হয়নি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসতে হবে। এ ছাড়া আমাদের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও সমস্যা রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যেই অনেকে রয়েছেন, যারা মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে নানা যুক্তি তুলে বাজার অস্থির করে তোলেন। সেদিকেও নজর দিতে হবে।

বিকল্প দেশ থেকে আমদানি বাড়ানোতে নজর দেওয়া হলেও পার্শ¦বর্তী দেশ থেকে আমদানি অনেকটা সুবিধাজনক বলে মনে করেন বিশিষ্ট বাজার বিশ্লেষক ও সাবেক বাণিজ্য সচিব গোলাম রহমান। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, ব্যবসা তার আপন গতিতে চলবে। যেখানে কম খরচে ও স্বচ্ছন্দে পণ্য আমদানি করে মুনাফা করা যায় স্বাভাবিকভাবে ব্যবসায়ীরা সেদিকে যাবে। এখানে কোন দেশ থেকে আসছে সেটা মুখ্য নয়। রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এক করা যাবে না। তাতে ভালো কিছু হবে না। পাশ্ববর্তী দেশের যদি রপ্তানিতে কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকে, তাহলে সেখান থেকেই আমদানি করা সুবিধাজনক হবে। যদি এমনটা হয় যে, আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে কিংবা কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে বিকল্প দেশ থেকে আমদানি বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া যেতেই পারে।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাবেক এই সভাপতি আরও বলেন, আমদানির পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনও বাড়াতে হবে। পেঁয়াজ, আলু, চালের মতো যেসব পণ্যের উৎপাদন দেশেই হয়, সেগুলোর উৎপাদন বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থারও উন্নতি করতে হবে।

আপডেট : ১২:৪২:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৪

পণ্য আমদানিতে বিকল্প দেশের সন্ধানে সরকার

আপডেট : ১২:৪২:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৪
৯২

মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে পিষ্ট সাধারণ মানুষ; সরকারও বিব্রত। টানা আট মাস ধরে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে আছে। গত নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ গত বছরের নভেম্বরে ১০০ টাকায় যে খাদ্য কেনা গেছে, চলতি বছরের নভেম্বরে একই পরিমাণ খাদ্যপণ্য কিনতে প্রয়োজন হচ্ছে ১১৩ টাকা ৮০ পয়সা। এটি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো কাজ করছে না। এর মধ্যে আগস্টের পর দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে অনেক পণ্যের আমদানি বিঘ্নিত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। এ থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে এবং দীর্ঘদিনের এই নির্ভরতা কাটাতে নিত্যপণ্য আমদানিতে বিকল্প দেশের সন্ধান করছে সরকার। একক উৎস-দেশের ওপর নির্ভরতা কাটাতে বিকল্প দেশ খোঁজার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও (বিটিটিসি)। ইতোমধ্যে বিটিটিসি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। সেখানে ভারতের পাশাপাশি আরও কিছু দেশ চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আলু-পেঁয়াজের দাম ও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে বিকল্প উৎসের সন্ধান দিয়েছে বিটিটিসি। বিটিটিসির এ প্রস্তাবনার ধারাবাহিতকায় বিকল্প দেশ থেকে এসব পণ্য আমদানিতে আমদানিকারকদের মনোযোগী হওয়ার কথা জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও মনে করেন, যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা থাকলে নিত্যপণ্যের চাহিদা পূরণে বিকল্প দেশ থেকে আমদানি করে দেশের সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ধরে রাখা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও বাজার পর্যবেক্ষণ থাকলে খরচও কমিয়ে আনা যাবে।

জানা গেছে, বর্তমানে ভারত ও মিয়ানমার এ দুই দেশ থেকে পেঁয়াজ বেশি আমদানি হচ্ছে। পাশাপাশি স্বল্প পরিসরে পাকিস্তান, চীন ও তুরস্ক থেকেও আমদানি হচ্ছে। আর আলু আমদানি হচ্ছে শুধু ভারত থেকে। এক্ষেত্রে আলু আমদানিতে জার্মান, মিশর, চীন ও স্পেনের কথা বলা হয়েছে বিটিটিসির প্রতিবেদনে। আর চীন, পাকিস্তান ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানির কথা বলা হয়েছে।

বিটিটিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরে বাংলাদেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৬ থেকে ২৮ লাখ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ৩৯ লাখ টন। তবে ৩০ শতাংশ সংরক্ষণকালীন ক্ষতি ও বীজ বাদে সরবরাহ হয়েছে ২৭ লাখ টনের কিছু বেশি। যদিও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, উৎপাদন ও চাহিদার হিসাব ঠিক নেই। এ কারণে দেশে ভালো উৎপাদনের পরও চাহিদার অন্তত ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর, চীন ও মিয়ানমার থেকে সাড়ে ৯ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।

আলুর বিষয়ে বলা হয়েছে, দেশে বছরে আলুর চাহিদা ৮৫ থেকে ৯০ লাখ টন। স্থানীয় উৎপাদন ১০৬ লাখ টন। ২৫ শতাংশ সংরক্ষণকালীন ক্ষতি ও বীজ বাদে সরবরাহ সাড়ে ৭৯ লাখ টন। ভারত থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আলু আমদানি হয়েছে দেড় লাখ টন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন আমাদের সময়কে বলেন, জিনিসপত্রের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের কষ্টের বিষয়ে সরকার অবগত। দাম কমানোর ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ চেষ্টা বহাল আছে। এ পর্যন্ত নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে ইতোমধ্যে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তাদের স্বস্তি আসতে শুরু করেছে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও পরিমাণ আরও বাড়ানো গেলে দ্রুত দ্রব্যমূল্যে স্থিতিশীলতা আসবে। তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে কিছু তাৎক্ষণিক ও কিছু দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দাম বেড়ে যাওয়ার পর আমরা টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে আলু বিক্রি শুরু করেছি। পাশাপাশি আলু আমদানির অনুমোদনও দেওয়া আছে। এসব তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ। অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহযোগিতায় খেজুর, চিনি, সয়াবিন তেল, ডিমসহ আরও কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমানো হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হবে, এটা মেনে নিয়েই শুধু পণ্যমূল্যের স্থিতিশীলতা আনতে এসব শুল্ক কমানো হয়েছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চাহিদা-জোগানের ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশকে উদার ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয় বাজারে যে সিন্ডিকেটের কথা বলা হয়, এখন দেশের ক্ষেত্রে (পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে) সিন্ডিকেট হলেও সমস্যা। অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক নয়। বাংলাদেশের জন্য ভারত, পাকিস্তান বা চীন কোনো ইস্যু নয়; বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবাইকে আমরা সংযুক্ত করতে চাই।

দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে পার্শ¦বর্তী দেশ ভারত থেকে প্রতিবছর পেঁয়াজ, চাল, ডাল, কাঁচামরিচ, আদা ও মসলাসহ অনেক ধরনের নিত্যপণ্য আমদানি হয়। অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে দেশটির ওপর নির্ভরতা অনেকখানি বেড়েছে। এ ছাড়া নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট একটি বা দুটি দেশের ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে। ফলে সেসব দেশে রপ্তানি কড়াকড়ি হলে কিংবা নিষেধাজ্ঞা দিলে দেশের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। তাই কোনো পণ্যের আমদানির জন্য কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প উৎসের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

বর্তমানে পেঁয়াজ ও আলুর বাজার সামাল দিতে সরকার শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। এরপরও আমদানি বাড়ছে না। খরচ বেড়ে যাওয়া এবং পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নানা প্রতিকূলতায় ভারত থেকে পণ্য আমদানি বিঘ্নিত হচ্ছে। অপরদিকে বিকল্প উৎস দেশগুলো থেকে স্বল্প পরিমাণে আমদানি হওয়ায় দেশের বাজারে সরবরাহ কাক্সিক্ষত পর্যায়ে বাড়ছে না। ফলে বাজারে স্বস্তি ফেরাতে সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে। এর মধ্যে আসন্ন রমজানে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তাই ভারতের পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলেছেন, পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়ায় সময় ও খরচ দুটোই কম লাগায় ভারত, মিয়ানমার থেকে পণ্য আমদানিতে বেশি ঝোঁক আমদানিকারকদের। অপরদিকে অন্য উৎস দেশগুলো থেকে আমদানির সম্ভাবনা থাকলেও সেদিকে নজর কম। কিন্তু সরকার মনোযোগ দিলে একটি-দুটি দেশের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে অন্য দেশগুলো থেকে আমদানি করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব। পেঁয়াজের জন্য চীন, মিশর, পাকিস্তান, তুরস্ক; চালের জন্য ভিয়েতনাম, লাওস, মিয়ানমার; ডালের জন্য অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক; আলুর জন্য হল্যান্ড, পোল্যান্ড; মসলার জন্য সিরিয়া, ইরান, ইন্দোনেশিয়া; আদার জন্য থাইল্যান্ড, চীন; গমের জন্য রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা- এসব উৎস দেশগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে রয়েছে ভোগ্যপণ্যের বড় পাইকারি কেন্দ্র। ভোজ্যতেল, চিনি, আটা-ময়দা ও মসলাসহ সব ধরনের নিত্যপণ্য এই বাজার থেকেই সংগ্রহ করেন রাজধানীসহ আশপাশের এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীরা।

কথা হলে মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা আমাদের সময়কে বলেন, নিকটবর্তী দেশ হওয়ায় ভারত কিংবা মিয়ানমার থেকে আমদানি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন আমাদের আমদানিকারকরা। কিন্তু বিকল্প উৎস দেশগুলোর দিকে নজর কম। এতে একটি বা দুটি দেশের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। আমদানিতে ভারতের ওপর যতটা না আমরা নির্ভরশীল, তার থেকেও বেশি নির্ভরশীল করে রাখা হয়েছে আমাদের। আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে বলে এসেছি, বিকল্প উৎস দেশ থেকে আমদানিতে গুরুত্ব দিতে। কিন্তু সময় বেশি লাগবে, খরচ বেশি বলা হয়েছে। আমরা বলেছি, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বিশ্ববাজারে এখন প্রতিযোগিতা বেড়েছে। আসন্ন রমজানে পণ্যবাজার নিয়ে তিনি বলেন, সরকার আসে সরকার যায়। কিন্তু আমাদের পরামর্শ কেউই শোনে না। রোজার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয় না। ফলে রমজান এলেই বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এবার রমজানের আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টার কোনো বৈঠক হয়নি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসতে হবে। এ ছাড়া আমাদের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও সমস্যা রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যেই অনেকে রয়েছেন, যারা মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে নানা যুক্তি তুলে বাজার অস্থির করে তোলেন। সেদিকেও নজর দিতে হবে।

বিকল্প দেশ থেকে আমদানি বাড়ানোতে নজর দেওয়া হলেও পার্শ¦বর্তী দেশ থেকে আমদানি অনেকটা সুবিধাজনক বলে মনে করেন বিশিষ্ট বাজার বিশ্লেষক ও সাবেক বাণিজ্য সচিব গোলাম রহমান। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, ব্যবসা তার আপন গতিতে চলবে। যেখানে কম খরচে ও স্বচ্ছন্দে পণ্য আমদানি করে মুনাফা করা যায় স্বাভাবিকভাবে ব্যবসায়ীরা সেদিকে যাবে। এখানে কোন দেশ থেকে আসছে সেটা মুখ্য নয়। রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এক করা যাবে না। তাতে ভালো কিছু হবে না। পাশ্ববর্তী দেশের যদি রপ্তানিতে কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকে, তাহলে সেখান থেকেই আমদানি করা সুবিধাজনক হবে। যদি এমনটা হয় যে, আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে কিংবা কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে বিকল্প দেশ থেকে আমদানি বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া যেতেই পারে।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাবেক এই সভাপতি আরও বলেন, আমদানির পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনও বাড়াতে হবে। পেঁয়াজ, আলু, চালের মতো যেসব পণ্যের উৎপাদন দেশেই হয়, সেগুলোর উৎপাদন বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থারও উন্নতি করতে হবে।