ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেওয়া বলদচালিত ঘানি:গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া এক নিঃশব্দ অধ্যায়

মোঃ আব্দুর রহমান অনিক।।
গ্রামে পর গ্রাম আছে এখন আর চোখে পড়ে না বলদচালিত সেই পুরোনো তেলের ঘানি, যা একসময় বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির হৃদস্পন্দন ছিল। আধুনিক মেশিনের শব্দে ভরা আজকের বাজারে এই ঘানিগুলো হারিয়ে গেছে। গুগলে সার্চ দিয়ে না দেখলে বোঝারও উপায় নেই।
এক কোণায় জীর্ণ চালার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বলদ আজও সেই কাঠের চক্র ঘোরাচ্ছে। চোখে কাপড় বাঁধা যেন সময়ের অন্ধকার তাকে ছুঁতে না পারে। চারদিকে কেরোসিনের গন্ধ, পুরোনো লোহার চাকার কটকট শব্দ আর মাটির মেঝেজুড়ে ছড়ানো খুপরি আলো। প্রথম দেখায় মনে হয়, ভুলে যাওয়া কোনো যুগের ছবি হঠাৎ চোখের সামনে ফিরে এসেছে।
চুয়াডাঙ্গার গ্রামগুলোতে একসময় যে কাঠের বিশাল চক্র ঘুরে তেল ঝরাত সেই দৃশ্য এখন শুধু গল্পে, স্মৃতিতে এবং পুরোনো মানুষের কণ্ঠে। বলদচালিত সেই ঘানি যা বাংলার খাদ্যসংস্কৃতি, অর্থনীতি ও কৃষিজীবনের অপরিহার্য অংশ ছিল। আজ আর বাস্তবজীবনে দেখা যায় না। গ্রাম থেকে গ্রাম ঘুরেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। যেন পুরো ব্যবস্থা সময়ের স্রোতে ভেসে গিয়ে কেবল ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে।
প্রবীণ বাসিন্দারা জানান ,
ফজরের আজানের পরপরই ঘানির কাছে যেতেন মানুষ। কাঠচাপার ঘূর্ণি শব্দ, বলদের ধীর পায়ের খসখস—সব মিলিয়ে গ্রামের সকাল ছিল আলাদা এক জীবনচক্রে বাঁধা।
৬৫ বছরের গিয়াস মিয়া বলেন,
আমাদের যৌবনে ঘানির শব্দ ছিল গ্রামের নিত্যদিনের আওয়াজ। এখন নাতিরা গুগলে না দেখলে বোঝেই না ঘানি কাকে বলে।
যেখানে একসময় ছিল কর্মচাঞ্চল্য, সেখানে এখন সব ইতিহাস।
চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ বহু এলাকায় ঘানি ছিল সেই ঘরগুলোর আয়ের প্রধান উৎস।
ভাঙা চালার নিচে পড়ে আছে ছারপোকার খাওয়া কাঠ, শেকলে জড়ানো পুরোনো পাথরের চাক আর কিছু সাদা ধুলো যা মনে করিয়ে দেয়, এখানে কোনো একসময় জীবন ছিল।
বলদচালিত ঘানি মালিকরা শেষ ঘানিটি প্রায় কতো বছর আগে ভাঙিয়েছেন সে তথ্য কারো কাছে নেই । এরপর আর কেউ নতুন করে চালায়নি।
কেন হারিয়ে গেল গ্রামীণ তেলের এই কারখানা?। মেশিনে দ্রুত উৎপাদন হয়, খরচ কম, শ্রম কম ফলে ঘানি টিকতে পারেনি।
কাঠের চাক ও লোহার বল্টু নষ্ট হলে মেরামত করার লোক মিলত না।
ঘানিচালক পরিবারের অনেকেই জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হয়ে যায়।
ঘানির খাঁটি তেল দামি ছিল, সাধারণ মানুষ সস্তা তেলে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
গ্রামের প্রবীণ নারী-পুরুষরা শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন ঘানির তেল ছিল স্বাদে আলাদা। কিন্তু ঘানি রইল না, বলদ রইল না, যারা চালাত তারাও নেই। এখন শুধু স্মৃতি।
কেউ কেউ পুরোনো একটি চিত্র এঁকে দেখান বলদ, কাঠের চক্র, পাশে বসা তেল সংগ্রহ করা মহিলারা। কিন্তু বাস্তবে সেই দৃশ্য এখন আর কোথাও নেই।
বলদ আর কাঠের সমন্বয়ে তৈরি এই তেল উৎপাদন প্রযুক্তি ছিল সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। বিদ্যুৎ লাগত না, শব্দদূষণ ছিল না, তেলের গুণ ছিল তুলনাহীন। তবুও আজ তা যান্ত্রিকতার সামনে হেরে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে নেই কোনো পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগও।
স্থানীয় পর্যায়ের কেউই আজ বলতে পারেন না শেষ ঘানিটা কখন ঘুরেছিল।
গ্রামের মাঠে, ধানের গোলায়, উঠোনে যেখানে একসময় ঘানির সুবাস ছড়াত, সেখানে এখন নীরবতার চাদর।
বলদচালিত ঘানি আজ বাস্তব নয় এটি এখন গ্রামবাংলার হারানো ঐতিহ্যের একটি অধ্যায়,
যা কেবল স্মৃতি, গল্প আর ইতিহাসে বেঁচে আছে।




















