দীর্ঘদিনের অবহেলিত জনপদ চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা: আজও স্বপ্ন দেখে উন্নয়নের!

মোঃ আব্দুর রহমান অনিক।।
চুয়াডাঙ্গা জেলার সীমান্তবর্তী শহর দর্শনা—এক সময় যেটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বানিজ্যিক ও কূটনৈতিক কেন্দ্র ছিল, আজ তা দীর্ঘদিনের অবহেলায় হারিয়েছে তার অতীত গৌরব। অথচ এই জনপদের বুকেই রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা।
দর্শনা দেশের প্রথম রেলবন্দর হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিল। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত দর্শনা রেলস্টেশন ছিল ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগের একটি প্রধান পথ। স্বাধীনতার আগে-পরে গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবেও দর্শনার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। এখান থেকে যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, এমনকি কলকাতা পর্যন্ত রেলপথে সহজেই যাওয়া যেত। এখনো ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ -এর মতো আন্তর্জাতিক ট্রেন চলাচল করেছে এই পথ দিয়েই।
তবে দুঃখজনকভাবে, দর্শনা আজ উন্নয়নের দৃষ্টিতে অনেকটাই উপেক্ষিত। রাস্তা-ঘাটের বেহাল অবস্থা, সেবাখাতের সীমাবদ্ধতা, আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা যেন এই জনপদকে পিছিয়ে রেখেছে। অথচ এখানে রয়েছে ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের সবচেয়ে বড় চিনিকল দর্শনা কেরু এ্যান্ড কোম্পানি । যা ৩,৫৭২ একর জায়গার উপর অবস্থিত পুরো কমপ্লেক্সটি চিনি কারখানা, ডিস্টিলারি ওয়াটার, বানিজ্যিক খামার ও জৈব সার কারখানার সমন্বয়ে গঠিত। এই কারখানার প্রধান উৎপাদিত পণ্য চিনি হলেও উপজাত পণ্য থেকে স্পিরিট, হার্ড ড্রিঙ্কস এবং জৈব সার উৎপাদন করা হয়। আর কেরু এ্যান্ড কোম্পানির দোতালা গেস্ট হাউজ দেশ-বিদেশে বেশ পরিচিত । আছে দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে জংশন, আর এই রেল বন্দর দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের শত শত নাগরিক যাতায়াতসহ নানা ধরণের পণ্য আমদানী-রপ্তানি করা হয় । দর্শনা জিরো পয়েন্টের কাছে অবস্থিত কাস্টমস চেকপোস্টের স্থায়ী অবকাঠামো বা শুল্ক ষ্টেশন দর্শনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা। এই শুল্ক ষ্টেশন থেকে সরকারী বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায় হয়, এছাড়া দর্শনায় রয়েছে রেল বাজার, একটি মডেল থানা,একটি দ্বিতীয় শ্রেনীর পৌরসভা, একটি সরকারি কলেজ,৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সহ বহু সরকারি -বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যা সঠিক পরিকল্পনায় ব্যবহার করা গেলে দর্শনা হয়ে উঠতে পারত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক আদর্শ উন্নয়ন মডেল অঞ্চলে।
দর্শনার স্থানীয় জনগণ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের আশায় দিন গুনছে। তারা চান একটি আধুনিক হাসপাতাল, মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। দর্শনার মতো একটি সম্ভাবনাময় শহর আজ শুধু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার অপেক্ষায় চেয়ে আছে ।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোঃ সোলেমান মিয়ার মতে, সরকার ও বেসরকারি খাত যৌথভাবে বিনিয়োগের মাধ্যমে দর্শনাকে একটি আধুনিক মডেল শহরে রূপান্তর করতে পারে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্পায়ন এবং পর্যটন খাতের বিকাশের মাধ্যমে এই জনপদটি জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে।
দর্শনা শুধু একটি শহরের নাম নয়, এটি একটি ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি, সম্ভাবনার গল্প।।




















