চুয়াডাঙ্গা ০৭:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কী অত্যাসন্ন?

Padma Sangbad
৫৩

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কী অত্যাসন্ন হয়ে পড়েছে? এই দু’টি পরাক্রমশালী দেশ কি এই মুহূর্তেই যুদ্ধে জড়াবে? এমন প্রশ্ন এখন পৃথিবীর অধিকাংশ মিডিয়ার। কারণ, কাশ্মিরে হামলায় ২৬ জন নিহত হয়েছেন। এ হামলায় জড়িতদের মধ্যে দুইজন পাকিস্তানি চিহ্নিত হয়েছেন। আর কাশ্মীরের হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘হামলাকারীদের দুনিয়ার শেষ প্রান্তে গিয়েও খুঁজে বের করব’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এর বিপরীতে ভারতীয় বিমানের জন্য আকাশসীমা বন্ধসহ একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান।

# কাশ্মীরের হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা ঘোষণা
# পাকিস্তানের সঙ্গে স্থলসীমান্ত বন্ধসহ ৫ সিদ্ধান্ত ভারতের
# ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের নোটিশ জারি পাকিস্তানের
# হামলাকারীদের দুনিয়ার শেষ প্রান্তে গিয়েও খুঁজে বের করার নির্দেশ মোদীর
# পাকিস্তানি মন্ত্রী বললেন সিন্ধু চুক্তি স্থগিত মানে ‘পানি যুদ্ধ’
বিভিন্ন মিডিয়ায় বলা হয়েছে, ভারতশাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে ভারত। দেশটি এই হামলার নেপথ্যে পাকিস্তানকেই দায়ী করেছে। এরই মধ্যে কাশ্মীরে এই হামলার দায় স্বীকার করেছে ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ) নামের একটি জঙ্গি সংগঠন। সংগঠনটি পাকিস্তান-ভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার একটি শাখা। ধারণা করা হয়, টিআরএফ-এর পেছনে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর সমর্থন আছে।
কাশ্মীরে হামলার ঘটনার পর বুধবার ভারতের নিরাপত্তা বিষয়ক সর্বোচ্চ কমিটি- ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিওরিটি বা সিসিএস বৈঠকে বসে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে ওই বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের পর জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি জানান, বৈঠকে সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে সীমান্তপারের যোগসাজস রয়েছে। তিনি বলেন, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু-কাশ্মীরে সাফল্যের সঙ্গে নির্বাচন হওয়ার পরেই এই আক্রমণ হলো। এমন একটা সময়ে হামলা হলো যখন সেখানে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।
বুধবার রাতে বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে মিশ্রি ঘোষণা করেন, সন্ত্রাসী হামলার গুরুত্ব অনুধাবন করে নিচের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে:
১. ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলবন্টন চুক্তি অবিলম্বে স্থগিত করা হচ্ছে, যতক্ষণ না পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্যভাবে এবং পাকাপাকিভাবে সীমান্ত পারের সন্ত্রাসের প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে।
২. পাঞ্জাবে অবস্থিত সমন্বিত আটারি চেকপোস্ট অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ওই পথ দিয়ে যারা বৈধভাবে পারাপার করেছেন তারা পয়লা মে-র আগেই ফিরতে পারবেন।
৩. সার্ক দেশগুলোর জন্য ‘বিনা ভিসা প্রকল্প’-এর অধীন বিশেষ ভিসা নিয়ে পাকিস্তানের নাগরিকরা ভারতে ভ্রমণ করতে পারবেন না। যে পাকিস্তানি নাগরিকদের আগেই ওই ভিসা দেওয়া হয়েছে, তা বাতিল করা হলো। ওই বিশেষ ভিসা নিয়ে ইতিমধ্যেই ভারতে রয়েছেন যে পাকিস্তানের নাগরিকরা, তাদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত ছাড়তে হবে।
৪. দিল্লিতে পাকিস্তানি দূতাবাসে সেদেশের প্রতিরক্ষা, সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর যে ‘পরামর্শদাতারা’ রয়েছেন, তাদের ‘পার্সোনা নন গ্রাটা’, অর্থাৎ অবাঞ্ছিত বলে ঘোষণা করছে ভারত। তাদের এক সপ্তাহের মধ্যে ভারত ছাড়তে হবে।
ভারতও ইসলামাবাদে তাদের দূতাবাস থেকে সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর পরামর্শদাতাদের ফিরিয়ে আনবে। দুই দেশের দূতাবাসগুলোতে এই পদগুলো বিলুপ্ত করা হলো। দুই দেশের দূতাবাসেরই সামরিক পরামর্শদাতাদের পাঁচজন করে কর্মীকেও নিজের দেশে চলে যেতে হবে।
৫. দুই দেশের রাজধানীতে অবস্থিত কর্মী সংখ্যা বর্তমানের ৫৫ থেকে কমিয়ে পয়লা মের মধ্যে ৩০ এ নিয়ে আসতে হবে।
এদিকে ভারতের এমন কড়া সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিটির (এনএসসি) জরুরি বৈঠক ডাকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ।
জিও নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে ভারতের নেওয়া পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করবে ইসলামাবাদ।
নয়াদিল্লিভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর ল্যান্ড ওয়ারফেয়ার স্টাডিজ’-এর (ক্লস) পরিচালক তারা কার্থা বলেছেন, এটি একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা। আমরা এটিকে সেভাবেই দেখছি। এমন এক সময় এটি ঘটল যখন কিছুদিন আগেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান বিতর্কিত একটি ভাষণ দিয়েছিলেন।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সচিবালয়ে দায়িত্ব পালন করে আসা তারা কার্থা পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের গত ১৬ এপ্রিল দেওয়া এক বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেছেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা কার্থা উল্লেখ করেছেন যে আসিম মুনির ওই বক্তব্যে ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের অনুঘটক দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি আবারও সমর্থন জানিয়েছেন এবং মুসলমানদের ‘হিন্দুদের থেকে আলাদা পরিচয়’-এর কথা জোর দিয়ে বলেন।
ভারতীয় এই কর্মকর্তার মতে পেহেলগামে যা ঘটেছে, তা মুনিরের ওই বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের ধারার সঙ্গে মিলে যায়।
এদিকে এরইমধ্যে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং কাশ্মীর হামলার জবাবে পাল্টা জোরালো এবং স্পষ্ট জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ার বার্তা দিয়েছেন। মোদিও অঙ্গীকার করেছেন, এই হামলার জবাব দেওয়া হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতীয় এক নিরাপত্তা বিশ্লেষক গার্ডিয়ানকে বলেছেন, পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনির কাশ্মীরকে পাকিস্তানের ‘গলার শিরা’ হিসেবে উল্লেখ ও কাশ্মীরিদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে তাদের ত্যাগ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে এই হামলা হলো।
মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি লেখক ও দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, এই অঞ্চলের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দুটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশী একে অপরের দিকে ঠাউর হয়ে আছে।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি সফর সংক্ষিপ্ত করে মোদির দ্রুত ভারতে চলে আসাও ইঙ্গিত দেয় যে কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার জবাব দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভারত সরকার।
এ ছাড়া কাশ্মীরে এমন সময়ে হামলা হয়েছে যখন ভারতে অবস্থান করছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ-পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল।
এরই মধ্যে জেডি ভ্যান্স ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের প্রশংসা করেছেন এবং ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদারের কথা বলেছেন।
এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই হামলার নিন্দা জানিয়ে মোদির পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা, গার্ডিয়ান
অপরদিকে,
কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর উভয় দেশ পাল্টাপাল্টি কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে পাকিস্তান করাচি উপকূল থেকে সারফেস-টু-সারফেস মিসাইল উৎক্ষেপণের নোটিশ জারি করেছে। সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদসংস্থা এএনআই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪-২৫ এপ্রিল পাকিস্তান এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করবে। এএনআই বলছে, ভারতীয় সংস্থাগুলো এসব পদক্ষেপের ওপর কড়া নজর রাখছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি পাকিস্তান।
এদিকে, কাশ্মীরে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহতের জেরে সিন্ধু বুধবার পানি চুক্তি স্থগিতসহ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঁচটি পদক্ষেপ নিয়েছিল ভারত। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির (এনএসসি) বৈঠকে তার পাল্টায় বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাহ শরিফের সভাপতিত্বে ওই বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাঠানো বিবৃতিতে সিদ্ধান্তগুলো জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তান কঠোরভাবে ভারতের সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা নাকচ করেছে। পাকিস্তান বলেছে, এই চুক্তি বিশ্ব ব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া একটি বাধ্যবাধকতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি, এককভাবে এই চুক্তি স্থগিতের কোনো বিধান নেই। পানি ভারতের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু, তা দেশের ২৪ কোটি মানুষের জীবনরক্ষা করে এবং যে কোনো মূল্যে এই পানি পাওয়ার বিষয়টি রক্ষা করা হবে। সিন্ধু চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান যে পানি পাবে, তার প্রবাহ বন্ধ বা অন্যদিকে নেওয়ার যে কোনো চেষ্টা এবং ভাটি অঞ্চলের অধিকার ক্ষুন্ন করার চেষ্টা যুদ্ধের শামিল বলে বিবেচনা করা হবে এবং জাতীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পূর্ণ শক্তি ব্যবহার করে এর জবাব দেওয়া হবে।
পাকিস্তান বলেছে, ভারতের বেপরোয়া ও দায়িত্বহীন আচরণের, যা আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তসমূহ এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে, প্রেক্ষিতে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে সব দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্থগিতের অধিকার প্রয়োগ করবে এবং তা শুধু সিমলা চুক্তি স্থগিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আর তা ভারত পাকিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসবাদ উসকে দেওয়া, আন্তঃসীমান্ত হত্যা বন্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক আইন ও কাশ্মীর নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবসমূহ না মেনে চলা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
পাকিস্তান অবিলম্বে ওয়াগা সীমান্ত চৌকি বন্ধ করছে। এই পথ দিয়ে ভারত থেকে সব ধরনের চলাচল বন্ধ থাকবে। বৈধভাবে যারা এই পথ দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছেন তারা অবিলম্বে এখান দিয়ে ফেরত যেতে পারবেন না। তবে ৩০ এপ্রিলের পরে এই সুযোগ দেওয়া হবে না।
এদিকে, ভারতীয় নাগরিকদের দেওয়া সব সার্ক ভিসা বাতিল করেছে পাকিস্তান। এই ভিসার আওতায় পাকিস্তানে অবস্থানরত সব ভারতীয় নাগরিককে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশটি ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য শিখ ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হচ্ছে না।
ইসলামাবাদে ভারতীয় হাই কমিশনে নিযুক্ত দেশটির প্রতিরক্ষা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কর্মকর্তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে পাকিস্তান। অবিলম্বে তাদেরকে পাকিস্তান ছাড়তে বলা হয়েছে। তাদের সহায়তায় নিযুক্ত কর্মীদেরও ভারতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামাবাদে ভারতীয় হাই কমিশনে কর্মকর্তার সংখ্যা ৩০ জনে নামিয়ে আনতে বলেছে পাকিস্তান। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে তা করতে বলা হয়েছে।
ভারতের মালিকানাধীন বা ভারত থেকে পরিচালিত সব বিমান পরিবহন সংস্থার জন্য পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ করার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তান দিয়ে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে ভারতের সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিতের ঘোষণাও দিয়েছে ইসলামাবাদ।
এদিকে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের নেওয়া পাঁচটি পদক্ষেপ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু করেছে দিল্লি। তারা পাকিস্তানের নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ভিসা বাতিল করেছে। এর মধ্যে মেডিকেল ভিসাও রয়েছে। তাদের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভারত ছাড়তে বলা হয়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তানিদের জন্য ভিসা কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া পাকিস্তানে অবস্থানরত ভারতীয়দের অতি দ্রুত দেশে ফেরার পরামর্শ দিয়েছে নয়াদিল্লি।
কাশ্মীরের পেহেলগামে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় ২৬ ভারতীয় পর্যটক নিহত হওয়ার পর গতকাল এক জরুরি বৈঠকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঁচটি পদক্ষেপ নেয় ভারত।
বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পেহেলগামে হামলার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির গৃহীত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ভারত সরকার পাকিস্তানের নাগরিকদের ভিসা পরিষেবা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা তাৎক্ষণিক কার্যকর হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের নাগরিকদের কাছে থাকা সব ভারতীয় ভিসা আগামী রোববার (২৭ এপ্রিল) বাতিল হয়ে যাবে। পাকিস্তানি নাগরিকদের মেডিকেল ভিসার মেয়াদ থাকবে আগামী মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) পর্যন্ত।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের যেসব নাগরিক বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাদের অবশ্যই ভারত ছাড়তে হবে। এ ছাড়া ভারতের নাগরিকদের পাকিস্তান ভ্রমণ না করতে কঠোরভাবে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভারতের যেসব নাগরিক পাকিস্তানে অবস্থান করছেন, তাঁদের অতি দ্রুত ভারতে প্রত্যাবর্তন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ভারতশাসিত কাশ্মিরের পেহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর কাশ্মির ও ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে মণিপুর এবং মধ্য ও পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অংশেও।
বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ভারত ভ্রমণের বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বলে জানায় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।
ভারতের যেকোনো জায়গা ভ্রমণে ন্যূনতম দ্বিতীয় মাত্রার সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নির্দেশনায়। তবে দেশটির চারটি অঞ্চল ভ্রমণে সর্বোচ্চ চতুর্থ মাত্রার, অর্থাৎ ভ্রমণ না করার নির্দেশনা দিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি সহিংসতা এবং অপরাধের হুমকির কারণে মণিপুর ভ্রমণেও সর্বোচ্চ চতুর্থ মাত্রার সতর্কতা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ভারতের কেন্দ্রশাসিত জম্মু ও কাশ্মির অঞ্চলে সন্ত্রাসী হামলা এবং সহিংস বেসামরিক অস্থিরতা ঘটতে পারে। এই অঞ্চলটি ভ্রমণ করবেন না। তবে লাদাখ ও এর রাজধানী লেহ সফরের অনুমতি রয়েছে।
ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে সম্ভাব্য সশস্ত্র সংঘাতের ঝুঁকি থাকায় ওই অঞ্চল এড়িয়ে চলারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়েছে, মাওবাদী চরমপন্থি গোষ্ঠী অথবা নকশালপন্থিরা ভারতের একটি বিশাল অঞ্চলে সক্রিয়। এরা স্থানীয় পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে অনেক সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে।
এদের হুমকির তীব্রতার কারণে মার্কিন কর্মকর্তাদের বিহার, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় এবং উড়িষ্যা রাজ্যের বেশিরভাগ অঞ্চলে ভ্রমণের আগে অনুমতি নিতে হবে। তবে তারা যদি কেবল এই রাজ্যগুলোর রাজধানী শহরে ভ্রমণ করেন তবে অনুমতির প্রয়োজন নেই। মার্কিন কর্মকর্তাদের জন্য মহারাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল এবং মধ্যপ্রদেশের পূর্বাঞ্চলে ভ্রমণেও অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
এদিকে, ভারতশাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে ভারত। দেশটি এই হামলার নেপথ্যে পাকিস্তানকেই দায়ী করেছে। বৃহস্পতিবার জম্মু ও কাশ্মীরের পুলিশ সন্দেহভাজন তিন হামলাকারীর স্কেচ প্রকাশ করেছে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ সন্দেহভাজন দুইজন হামলাকারীকে চিহ্নিত করেছে। তারা পাকিস্তানের নাগরিক। তাদের গ্রেপ্তারে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারলে ২০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
অনন্তনাগের পুলিশ জানিয়েছে, সন্দেহভাজন হামলাকারীরা হচ্ছেন হাশিম মুসা ওরফে সুলেমান। তিনি পাকিস্তানের নাগরিক। এ ছাড়া আলি ভাই ওরফে তালহা ভাই- তিনিও পাকিস্তানের নাগরিক।
আরেক সন্দেহভাজন হামলাকারী হিসেবে আব্দুল হুসেইন থোকারের নাম জানিয়েছে পুলিশ। তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার বাসিন্দা।
দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, ধারণা করা হচ্ছে এই তিনজন হামলাকারীই পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়েবার সদস্য।
এদিকে হামলাকারী তার সমর্থকদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার মোদি বলেছেন, ভারত প্রতিটা সন্ত্রাসী এবং তাদের সমর্থকদের চিহ্নিত করবে, তাদের খুঁজে বের করবে এবং শাস্তি দেবে। তিনি বলেছেন, আমাদের মনোবল কখনও ভেঙে যাবে না।
বিহারের মধুবানিতে সরকারি এক অনুষ্ঠানে এসব মন্তব্য করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের প্রতি নীরব শ্রদ্ধা জানিয়ে ভাষণ শুরু করেন মোদি।
তিনি বলেছেন, পেহেলগামে সন্ত্রাসীরা যে নির্মমভাবে নিরীহ পর্যটকদের হত্যা করেছে, তাতে সমগ্র দেশ বেদনার্ত। পুরো দেশ শোকাহত পরিবারের পাশে আছে। সরকার আহতদের সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।
যেসব সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে এবং যারা এর পরিকল্পনা করেছে তারা এমন শাস্তি পাবে যে কল্পনাও করতে পারবে না। সন্ত্রাসের আশ্রয়স্থলে যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা ধ্বংস করার সময় এসেছে, বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
হামলার ঘটনার পর প্রথম প্রকাশ্য বার্তায় প্রতিটি সন্ত্রাসী ও তাদের মদতদাতাদের কল্পনাতীত শাস্তি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
কাশ্মীরে জঙ্গি হামলার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর প্রথম প্রকাশ্য জনসভা থেকে হামলার ঘটনায় জড়িতদের কড়া বার্তা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
বিহারের মধুবনির সভা থেকে তিনি বৃহস্পতিবার বলেন, প্রতিটি সন্ত্রাসী এবং তাদের মদতদাতাদের কল্পনাতীত শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। দুনিয়ার শেষ প্রান্তে গিয়েও হামলাকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করবে ভারত।
পঞ্চায়েতি রাজের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে পহেলগাঁওয়ের জঙ্গি হামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, “২২ এপ্রিল সন্ত্রাসীরা পর্যটকদের নিমর্মভাবে হৎয়া করেছে। কাশ্মীরে বেছে বেছে হিন্দু নিধন করা হয়েছে।
পহেলগাঁওয়ে নিরীহদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে জঙ্গিরা। হামলায় কেউ ছেলেকে হারিয়েছেন। কেউ বাবাকে হারিয়েছেন। কেউ হারিয়েছেন স্বামীকে। তাদের কেউ বাংলায় কথা বলতেন। আবার কেউ ওড়িয়া ভাষায় কথা বলতেন। কেউ গুজরাতের বাসিন্দা। কেউ বিহারের লাল।
এ হামলা কেবল পর্যটকদের ওপর নয়, এটি ভারতের আত্মার ওপর হামলা। হামলাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীরা কল্পনাও করতে পারবে না যে, তাদের কী শাস্তি হতে চলেছে। হামলাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেবে ভারত।
আমি গোটা দুনিয়াকে বিহারের মাটি থেকে বলতে চাই, ভারত প্রতিটি জঙ্গিকে চিহ্নিত করবে এবং শাস্তি দেবে। তাদের সহযোগিরাও ছাড় পাবে না। সুবিচারের জন্য যা যা দরকার সব করা হবে। এই বিষয়ে দেশ দৃঢ় সঙ্কল্প। ”
গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৪৫ থেকে ৩টার মধ্যে জঙ্গিরা হামলা চালায় দক্ষিণ কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার বেইসারান উপত্যকায়। পর্যটনে মেতে ওঠা এক উজ্জ্বল দুপুর মুহূর্তেই রূপ নেয় রক্তাক্ত বিভীষিকায়। নিহত হন ২৬ জন, আহত হন আরও অনেকে।
‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ) নামের একটি জঙ্গি সংগঠন এই ভয়াবহ হামলার দায় স্বীকার করেছে। এই সংগঠনটি পাকিস্তান-ভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার একটি শাখা।
উল্লেখ্য, পেহেলগামে মঙ্গলবারের সন্ত্রাসী হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন পর্যটক। ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর এটিই কাশ্মির উপত্যকায় সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলেছেন। এরই মধ্যে জঙ্গিদের কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
এদিকে, ১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সিন্ধু পানি বন্টন চুক্তি হযেছিল। সেসময় এ চুক্তিতে সই করেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান। পাকিস্তানের সঙ্গে ১৯৬৫, ১৯৭১ ও ১৯৯৯ সালের যুদ্ধেও এ চুক্তি টিকে ছিল, যা এবার অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে গেল।
পেহেলগামে জঙ্গি হামলার আগেই পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ ছিল; ২০১৯ সালে নয়া দিল্লি কাশ্মীরের আধা-স্বায়ত্তশাসন মর্যাদা বাতিল করার পর পাকিস্তান ভারতের দূতকে বহিষ্কার করে এবং এখন পর্যন্ত নয়া দিল্লিতে কোনো রাষ্ট্রদূতও পাঠায়নি।
ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পুরো কাশ্মীর নিজেদের বলে দাবি করলেও দুই দেশই আলাদা দুটি খণ্ড শাসন করছে। কাশ্মীরের কিছু অংশ চীনের দখলেও আছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তার দল বিজেপি কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলকে বড় অর্জন এবং মুসলিম অধ্যুষিত অশান্ত অঞ্চলটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে বলে দেখানোর চেষ্টা করছিল, মঙ্গলবারের হামলা তাতে জোর ধাক্কা দিয়েছে।
কাশ্মীরে হামলার ঘটনার পর ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের ওয়াঘা সীমান্তের প্রবেশদ্বারে ২৪ এপ্রিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পাহারা বাড়ানো হয়েছে। ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান ‘ক্রস-বর্ডার টেরোরিজমে’ মদদ দিচ্ছে।
কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এলাকায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় অঞ্চলটির সাম্প্রতিক শান্ত পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে।
এই পর্যটন এলাকাটি মুহূর্তেই রক্তাক্ত বিভীষিকার স্থলে পরিণত হয়েছে। এতে করে পরমাণু অস্ত্রধারী প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হামলার সময় বন্দুকধারীরা ঘন পাইন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে পরিবারগুলোকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
হামলার শিকার হওয়া লোকজন তখন পিকনিকের মেজাজে ছিলেন। কেউ কেউ ঘোড়ায় চড়ে ঘুরছিলেন।
এই নির্বিচার হত্যার ঘটনায় আবারও ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে গেছে। দুই দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ড কাশ্মীর নিয়ে তিনটি যুদ্ধ করেছে।
নাম প্রকাশ করতে চাননি—ভারতের এমন একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেছেন, হামলাটি এমন এক সময় হলো যখন মাত্র এক সপ্তাহ আগে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির কাশ্মীরকে পাকিস্তানের ‘জাগুলার’ (‘‘জাগুলার’’ মানে গলার শিরা বা জাগুলার ভেইন। এটি শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালিগুলোর একটি। কথ্য ভাষায় বা রাজনৈতিক ভাষণে ‘জাগুলার’ বলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জীবন-মরণের প্রশ্ন বা সবচেয়ে দুর্বল ও সংবেদনশীল জায়গাকে বোঝায়) বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের কাশ্মীরি ভাইদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে একা ফেলে দেব না।’
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক লেখক ও দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘এটি অঞ্চলটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। আমরা দেখছি, দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী এখন একে অপরের দিকে আক্রমণাত্মক চোখে তাকিয়ে আছে। এখন কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়।’
হামলার পর ভারত প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাকিস্তানের হাই কমিশনের প্রতিরক্ষা, নৌ ও বিমানবাহিনীর উপদেষ্টাদের বহিষ্কার করেছে; গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্য পথ বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং প্রথমবারের মতো সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে।
এই হামলার সময়টা রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়টাতেই যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারতে সফর করছিলেন।

আপডেট : ১২:৫৩:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৫

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কী অত্যাসন্ন?

আপডেট : ১২:৫৩:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৫
৫৩

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কী অত্যাসন্ন হয়ে পড়েছে? এই দু’টি পরাক্রমশালী দেশ কি এই মুহূর্তেই যুদ্ধে জড়াবে? এমন প্রশ্ন এখন পৃথিবীর অধিকাংশ মিডিয়ার। কারণ, কাশ্মিরে হামলায় ২৬ জন নিহত হয়েছেন। এ হামলায় জড়িতদের মধ্যে দুইজন পাকিস্তানি চিহ্নিত হয়েছেন। আর কাশ্মীরের হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘হামলাকারীদের দুনিয়ার শেষ প্রান্তে গিয়েও খুঁজে বের করব’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এর বিপরীতে ভারতীয় বিমানের জন্য আকাশসীমা বন্ধসহ একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান।

# কাশ্মীরের হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা ঘোষণা
# পাকিস্তানের সঙ্গে স্থলসীমান্ত বন্ধসহ ৫ সিদ্ধান্ত ভারতের
# ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের নোটিশ জারি পাকিস্তানের
# হামলাকারীদের দুনিয়ার শেষ প্রান্তে গিয়েও খুঁজে বের করার নির্দেশ মোদীর
# পাকিস্তানি মন্ত্রী বললেন সিন্ধু চুক্তি স্থগিত মানে ‘পানি যুদ্ধ’
বিভিন্ন মিডিয়ায় বলা হয়েছে, ভারতশাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে ভারত। দেশটি এই হামলার নেপথ্যে পাকিস্তানকেই দায়ী করেছে। এরই মধ্যে কাশ্মীরে এই হামলার দায় স্বীকার করেছে ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ) নামের একটি জঙ্গি সংগঠন। সংগঠনটি পাকিস্তান-ভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার একটি শাখা। ধারণা করা হয়, টিআরএফ-এর পেছনে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর সমর্থন আছে।
কাশ্মীরে হামলার ঘটনার পর বুধবার ভারতের নিরাপত্তা বিষয়ক সর্বোচ্চ কমিটি- ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিওরিটি বা সিসিএস বৈঠকে বসে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে ওই বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের পর জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি জানান, বৈঠকে সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে সীমান্তপারের যোগসাজস রয়েছে। তিনি বলেন, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু-কাশ্মীরে সাফল্যের সঙ্গে নির্বাচন হওয়ার পরেই এই আক্রমণ হলো। এমন একটা সময়ে হামলা হলো যখন সেখানে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।
বুধবার রাতে বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে মিশ্রি ঘোষণা করেন, সন্ত্রাসী হামলার গুরুত্ব অনুধাবন করে নিচের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে:
১. ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলবন্টন চুক্তি অবিলম্বে স্থগিত করা হচ্ছে, যতক্ষণ না পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্যভাবে এবং পাকাপাকিভাবে সীমান্ত পারের সন্ত্রাসের প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে।
২. পাঞ্জাবে অবস্থিত সমন্বিত আটারি চেকপোস্ট অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ওই পথ দিয়ে যারা বৈধভাবে পারাপার করেছেন তারা পয়লা মে-র আগেই ফিরতে পারবেন।
৩. সার্ক দেশগুলোর জন্য ‘বিনা ভিসা প্রকল্প’-এর অধীন বিশেষ ভিসা নিয়ে পাকিস্তানের নাগরিকরা ভারতে ভ্রমণ করতে পারবেন না। যে পাকিস্তানি নাগরিকদের আগেই ওই ভিসা দেওয়া হয়েছে, তা বাতিল করা হলো। ওই বিশেষ ভিসা নিয়ে ইতিমধ্যেই ভারতে রয়েছেন যে পাকিস্তানের নাগরিকরা, তাদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত ছাড়তে হবে।
৪. দিল্লিতে পাকিস্তানি দূতাবাসে সেদেশের প্রতিরক্ষা, সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর যে ‘পরামর্শদাতারা’ রয়েছেন, তাদের ‘পার্সোনা নন গ্রাটা’, অর্থাৎ অবাঞ্ছিত বলে ঘোষণা করছে ভারত। তাদের এক সপ্তাহের মধ্যে ভারত ছাড়তে হবে।
ভারতও ইসলামাবাদে তাদের দূতাবাস থেকে সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর পরামর্শদাতাদের ফিরিয়ে আনবে। দুই দেশের দূতাবাসগুলোতে এই পদগুলো বিলুপ্ত করা হলো। দুই দেশের দূতাবাসেরই সামরিক পরামর্শদাতাদের পাঁচজন করে কর্মীকেও নিজের দেশে চলে যেতে হবে।
৫. দুই দেশের রাজধানীতে অবস্থিত কর্মী সংখ্যা বর্তমানের ৫৫ থেকে কমিয়ে পয়লা মের মধ্যে ৩০ এ নিয়ে আসতে হবে।
এদিকে ভারতের এমন কড়া সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিটির (এনএসসি) জরুরি বৈঠক ডাকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ।
জিও নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে ভারতের নেওয়া পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করবে ইসলামাবাদ।
নয়াদিল্লিভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর ল্যান্ড ওয়ারফেয়ার স্টাডিজ’-এর (ক্লস) পরিচালক তারা কার্থা বলেছেন, এটি একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা। আমরা এটিকে সেভাবেই দেখছি। এমন এক সময় এটি ঘটল যখন কিছুদিন আগেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান বিতর্কিত একটি ভাষণ দিয়েছিলেন।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সচিবালয়ে দায়িত্ব পালন করে আসা তারা কার্থা পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের গত ১৬ এপ্রিল দেওয়া এক বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেছেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা কার্থা উল্লেখ করেছেন যে আসিম মুনির ওই বক্তব্যে ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের অনুঘটক দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি আবারও সমর্থন জানিয়েছেন এবং মুসলমানদের ‘হিন্দুদের থেকে আলাদা পরিচয়’-এর কথা জোর দিয়ে বলেন।
ভারতীয় এই কর্মকর্তার মতে পেহেলগামে যা ঘটেছে, তা মুনিরের ওই বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের ধারার সঙ্গে মিলে যায়।
এদিকে এরইমধ্যে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং কাশ্মীর হামলার জবাবে পাল্টা জোরালো এবং স্পষ্ট জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ার বার্তা দিয়েছেন। মোদিও অঙ্গীকার করেছেন, এই হামলার জবাব দেওয়া হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতীয় এক নিরাপত্তা বিশ্লেষক গার্ডিয়ানকে বলেছেন, পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনির কাশ্মীরকে পাকিস্তানের ‘গলার শিরা’ হিসেবে উল্লেখ ও কাশ্মীরিদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে তাদের ত্যাগ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে এই হামলা হলো।
মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি লেখক ও দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, এই অঞ্চলের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দুটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশী একে অপরের দিকে ঠাউর হয়ে আছে।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি সফর সংক্ষিপ্ত করে মোদির দ্রুত ভারতে চলে আসাও ইঙ্গিত দেয় যে কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার জবাব দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভারত সরকার।
এ ছাড়া কাশ্মীরে এমন সময়ে হামলা হয়েছে যখন ভারতে অবস্থান করছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ-পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল।
এরই মধ্যে জেডি ভ্যান্স ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের প্রশংসা করেছেন এবং ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদারের কথা বলেছেন।
এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই হামলার নিন্দা জানিয়ে মোদির পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা, গার্ডিয়ান
অপরদিকে,
কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর উভয় দেশ পাল্টাপাল্টি কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে পাকিস্তান করাচি উপকূল থেকে সারফেস-টু-সারফেস মিসাইল উৎক্ষেপণের নোটিশ জারি করেছে। সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদসংস্থা এএনআই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪-২৫ এপ্রিল পাকিস্তান এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করবে। এএনআই বলছে, ভারতীয় সংস্থাগুলো এসব পদক্ষেপের ওপর কড়া নজর রাখছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি পাকিস্তান।
এদিকে, কাশ্মীরে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহতের জেরে সিন্ধু বুধবার পানি চুক্তি স্থগিতসহ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঁচটি পদক্ষেপ নিয়েছিল ভারত। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির (এনএসসি) বৈঠকে তার পাল্টায় বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাহ শরিফের সভাপতিত্বে ওই বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাঠানো বিবৃতিতে সিদ্ধান্তগুলো জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তান কঠোরভাবে ভারতের সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা নাকচ করেছে। পাকিস্তান বলেছে, এই চুক্তি বিশ্ব ব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া একটি বাধ্যবাধকতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি, এককভাবে এই চুক্তি স্থগিতের কোনো বিধান নেই। পানি ভারতের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু, তা দেশের ২৪ কোটি মানুষের জীবনরক্ষা করে এবং যে কোনো মূল্যে এই পানি পাওয়ার বিষয়টি রক্ষা করা হবে। সিন্ধু চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান যে পানি পাবে, তার প্রবাহ বন্ধ বা অন্যদিকে নেওয়ার যে কোনো চেষ্টা এবং ভাটি অঞ্চলের অধিকার ক্ষুন্ন করার চেষ্টা যুদ্ধের শামিল বলে বিবেচনা করা হবে এবং জাতীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পূর্ণ শক্তি ব্যবহার করে এর জবাব দেওয়া হবে।
পাকিস্তান বলেছে, ভারতের বেপরোয়া ও দায়িত্বহীন আচরণের, যা আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তসমূহ এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে, প্রেক্ষিতে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে সব দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্থগিতের অধিকার প্রয়োগ করবে এবং তা শুধু সিমলা চুক্তি স্থগিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আর তা ভারত পাকিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসবাদ উসকে দেওয়া, আন্তঃসীমান্ত হত্যা বন্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক আইন ও কাশ্মীর নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবসমূহ না মেনে চলা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
পাকিস্তান অবিলম্বে ওয়াগা সীমান্ত চৌকি বন্ধ করছে। এই পথ দিয়ে ভারত থেকে সব ধরনের চলাচল বন্ধ থাকবে। বৈধভাবে যারা এই পথ দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছেন তারা অবিলম্বে এখান দিয়ে ফেরত যেতে পারবেন না। তবে ৩০ এপ্রিলের পরে এই সুযোগ দেওয়া হবে না।
এদিকে, ভারতীয় নাগরিকদের দেওয়া সব সার্ক ভিসা বাতিল করেছে পাকিস্তান। এই ভিসার আওতায় পাকিস্তানে অবস্থানরত সব ভারতীয় নাগরিককে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশটি ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য শিখ ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হচ্ছে না।
ইসলামাবাদে ভারতীয় হাই কমিশনে নিযুক্ত দেশটির প্রতিরক্ষা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কর্মকর্তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে পাকিস্তান। অবিলম্বে তাদেরকে পাকিস্তান ছাড়তে বলা হয়েছে। তাদের সহায়তায় নিযুক্ত কর্মীদেরও ভারতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামাবাদে ভারতীয় হাই কমিশনে কর্মকর্তার সংখ্যা ৩০ জনে নামিয়ে আনতে বলেছে পাকিস্তান। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে তা করতে বলা হয়েছে।
ভারতের মালিকানাধীন বা ভারত থেকে পরিচালিত সব বিমান পরিবহন সংস্থার জন্য পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ করার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তান দিয়ে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে ভারতের সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিতের ঘোষণাও দিয়েছে ইসলামাবাদ।
এদিকে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের নেওয়া পাঁচটি পদক্ষেপ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু করেছে দিল্লি। তারা পাকিস্তানের নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ভিসা বাতিল করেছে। এর মধ্যে মেডিকেল ভিসাও রয়েছে। তাদের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভারত ছাড়তে বলা হয়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তানিদের জন্য ভিসা কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া পাকিস্তানে অবস্থানরত ভারতীয়দের অতি দ্রুত দেশে ফেরার পরামর্শ দিয়েছে নয়াদিল্লি।
কাশ্মীরের পেহেলগামে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় ২৬ ভারতীয় পর্যটক নিহত হওয়ার পর গতকাল এক জরুরি বৈঠকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঁচটি পদক্ষেপ নেয় ভারত।
বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পেহেলগামে হামলার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির গৃহীত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ভারত সরকার পাকিস্তানের নাগরিকদের ভিসা পরিষেবা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা তাৎক্ষণিক কার্যকর হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের নাগরিকদের কাছে থাকা সব ভারতীয় ভিসা আগামী রোববার (২৭ এপ্রিল) বাতিল হয়ে যাবে। পাকিস্তানি নাগরিকদের মেডিকেল ভিসার মেয়াদ থাকবে আগামী মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) পর্যন্ত।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের যেসব নাগরিক বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাদের অবশ্যই ভারত ছাড়তে হবে। এ ছাড়া ভারতের নাগরিকদের পাকিস্তান ভ্রমণ না করতে কঠোরভাবে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভারতের যেসব নাগরিক পাকিস্তানে অবস্থান করছেন, তাঁদের অতি দ্রুত ভারতে প্রত্যাবর্তন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ভারতশাসিত কাশ্মিরের পেহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর কাশ্মির ও ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে মণিপুর এবং মধ্য ও পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অংশেও।
বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ভারত ভ্রমণের বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বলে জানায় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।
ভারতের যেকোনো জায়গা ভ্রমণে ন্যূনতম দ্বিতীয় মাত্রার সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নির্দেশনায়। তবে দেশটির চারটি অঞ্চল ভ্রমণে সর্বোচ্চ চতুর্থ মাত্রার, অর্থাৎ ভ্রমণ না করার নির্দেশনা দিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি সহিংসতা এবং অপরাধের হুমকির কারণে মণিপুর ভ্রমণেও সর্বোচ্চ চতুর্থ মাত্রার সতর্কতা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ভারতের কেন্দ্রশাসিত জম্মু ও কাশ্মির অঞ্চলে সন্ত্রাসী হামলা এবং সহিংস বেসামরিক অস্থিরতা ঘটতে পারে। এই অঞ্চলটি ভ্রমণ করবেন না। তবে লাদাখ ও এর রাজধানী লেহ সফরের অনুমতি রয়েছে।
ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে সম্ভাব্য সশস্ত্র সংঘাতের ঝুঁকি থাকায় ওই অঞ্চল এড়িয়ে চলারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়েছে, মাওবাদী চরমপন্থি গোষ্ঠী অথবা নকশালপন্থিরা ভারতের একটি বিশাল অঞ্চলে সক্রিয়। এরা স্থানীয় পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে অনেক সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে।
এদের হুমকির তীব্রতার কারণে মার্কিন কর্মকর্তাদের বিহার, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় এবং উড়িষ্যা রাজ্যের বেশিরভাগ অঞ্চলে ভ্রমণের আগে অনুমতি নিতে হবে। তবে তারা যদি কেবল এই রাজ্যগুলোর রাজধানী শহরে ভ্রমণ করেন তবে অনুমতির প্রয়োজন নেই। মার্কিন কর্মকর্তাদের জন্য মহারাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল এবং মধ্যপ্রদেশের পূর্বাঞ্চলে ভ্রমণেও অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
এদিকে, ভারতশাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে ভারত। দেশটি এই হামলার নেপথ্যে পাকিস্তানকেই দায়ী করেছে। বৃহস্পতিবার জম্মু ও কাশ্মীরের পুলিশ সন্দেহভাজন তিন হামলাকারীর স্কেচ প্রকাশ করেছে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ সন্দেহভাজন দুইজন হামলাকারীকে চিহ্নিত করেছে। তারা পাকিস্তানের নাগরিক। তাদের গ্রেপ্তারে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারলে ২০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
অনন্তনাগের পুলিশ জানিয়েছে, সন্দেহভাজন হামলাকারীরা হচ্ছেন হাশিম মুসা ওরফে সুলেমান। তিনি পাকিস্তানের নাগরিক। এ ছাড়া আলি ভাই ওরফে তালহা ভাই- তিনিও পাকিস্তানের নাগরিক।
আরেক সন্দেহভাজন হামলাকারী হিসেবে আব্দুল হুসেইন থোকারের নাম জানিয়েছে পুলিশ। তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার বাসিন্দা।
দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, ধারণা করা হচ্ছে এই তিনজন হামলাকারীই পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়েবার সদস্য।
এদিকে হামলাকারী তার সমর্থকদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার মোদি বলেছেন, ভারত প্রতিটা সন্ত্রাসী এবং তাদের সমর্থকদের চিহ্নিত করবে, তাদের খুঁজে বের করবে এবং শাস্তি দেবে। তিনি বলেছেন, আমাদের মনোবল কখনও ভেঙে যাবে না।
বিহারের মধুবানিতে সরকারি এক অনুষ্ঠানে এসব মন্তব্য করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের প্রতি নীরব শ্রদ্ধা জানিয়ে ভাষণ শুরু করেন মোদি।
তিনি বলেছেন, পেহেলগামে সন্ত্রাসীরা যে নির্মমভাবে নিরীহ পর্যটকদের হত্যা করেছে, তাতে সমগ্র দেশ বেদনার্ত। পুরো দেশ শোকাহত পরিবারের পাশে আছে। সরকার আহতদের সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।
যেসব সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে এবং যারা এর পরিকল্পনা করেছে তারা এমন শাস্তি পাবে যে কল্পনাও করতে পারবে না। সন্ত্রাসের আশ্রয়স্থলে যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা ধ্বংস করার সময় এসেছে, বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
হামলার ঘটনার পর প্রথম প্রকাশ্য বার্তায় প্রতিটি সন্ত্রাসী ও তাদের মদতদাতাদের কল্পনাতীত শাস্তি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
কাশ্মীরে জঙ্গি হামলার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর প্রথম প্রকাশ্য জনসভা থেকে হামলার ঘটনায় জড়িতদের কড়া বার্তা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
বিহারের মধুবনির সভা থেকে তিনি বৃহস্পতিবার বলেন, প্রতিটি সন্ত্রাসী এবং তাদের মদতদাতাদের কল্পনাতীত শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। দুনিয়ার শেষ প্রান্তে গিয়েও হামলাকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করবে ভারত।
পঞ্চায়েতি রাজের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে পহেলগাঁওয়ের জঙ্গি হামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, “২২ এপ্রিল সন্ত্রাসীরা পর্যটকদের নিমর্মভাবে হৎয়া করেছে। কাশ্মীরে বেছে বেছে হিন্দু নিধন করা হয়েছে।
পহেলগাঁওয়ে নিরীহদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে জঙ্গিরা। হামলায় কেউ ছেলেকে হারিয়েছেন। কেউ বাবাকে হারিয়েছেন। কেউ হারিয়েছেন স্বামীকে। তাদের কেউ বাংলায় কথা বলতেন। আবার কেউ ওড়িয়া ভাষায় কথা বলতেন। কেউ গুজরাতের বাসিন্দা। কেউ বিহারের লাল।
এ হামলা কেবল পর্যটকদের ওপর নয়, এটি ভারতের আত্মার ওপর হামলা। হামলাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীরা কল্পনাও করতে পারবে না যে, তাদের কী শাস্তি হতে চলেছে। হামলাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেবে ভারত।
আমি গোটা দুনিয়াকে বিহারের মাটি থেকে বলতে চাই, ভারত প্রতিটি জঙ্গিকে চিহ্নিত করবে এবং শাস্তি দেবে। তাদের সহযোগিরাও ছাড় পাবে না। সুবিচারের জন্য যা যা দরকার সব করা হবে। এই বিষয়ে দেশ দৃঢ় সঙ্কল্প। ”
গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৪৫ থেকে ৩টার মধ্যে জঙ্গিরা হামলা চালায় দক্ষিণ কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার বেইসারান উপত্যকায়। পর্যটনে মেতে ওঠা এক উজ্জ্বল দুপুর মুহূর্তেই রূপ নেয় রক্তাক্ত বিভীষিকায়। নিহত হন ২৬ জন, আহত হন আরও অনেকে।
‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ) নামের একটি জঙ্গি সংগঠন এই ভয়াবহ হামলার দায় স্বীকার করেছে। এই সংগঠনটি পাকিস্তান-ভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার একটি শাখা।
উল্লেখ্য, পেহেলগামে মঙ্গলবারের সন্ত্রাসী হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন পর্যটক। ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর এটিই কাশ্মির উপত্যকায় সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলেছেন। এরই মধ্যে জঙ্গিদের কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
এদিকে, ১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সিন্ধু পানি বন্টন চুক্তি হযেছিল। সেসময় এ চুক্তিতে সই করেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান। পাকিস্তানের সঙ্গে ১৯৬৫, ১৯৭১ ও ১৯৯৯ সালের যুদ্ধেও এ চুক্তি টিকে ছিল, যা এবার অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে গেল।
পেহেলগামে জঙ্গি হামলার আগেই পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ ছিল; ২০১৯ সালে নয়া দিল্লি কাশ্মীরের আধা-স্বায়ত্তশাসন মর্যাদা বাতিল করার পর পাকিস্তান ভারতের দূতকে বহিষ্কার করে এবং এখন পর্যন্ত নয়া দিল্লিতে কোনো রাষ্ট্রদূতও পাঠায়নি।
ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পুরো কাশ্মীর নিজেদের বলে দাবি করলেও দুই দেশই আলাদা দুটি খণ্ড শাসন করছে। কাশ্মীরের কিছু অংশ চীনের দখলেও আছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তার দল বিজেপি কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলকে বড় অর্জন এবং মুসলিম অধ্যুষিত অশান্ত অঞ্চলটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে বলে দেখানোর চেষ্টা করছিল, মঙ্গলবারের হামলা তাতে জোর ধাক্কা দিয়েছে।
কাশ্মীরে হামলার ঘটনার পর ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের ওয়াঘা সীমান্তের প্রবেশদ্বারে ২৪ এপ্রিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পাহারা বাড়ানো হয়েছে। ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান ‘ক্রস-বর্ডার টেরোরিজমে’ মদদ দিচ্ছে।
কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এলাকায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় অঞ্চলটির সাম্প্রতিক শান্ত পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে।
এই পর্যটন এলাকাটি মুহূর্তেই রক্তাক্ত বিভীষিকার স্থলে পরিণত হয়েছে। এতে করে পরমাণু অস্ত্রধারী প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হামলার সময় বন্দুকধারীরা ঘন পাইন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে পরিবারগুলোকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
হামলার শিকার হওয়া লোকজন তখন পিকনিকের মেজাজে ছিলেন। কেউ কেউ ঘোড়ায় চড়ে ঘুরছিলেন।
এই নির্বিচার হত্যার ঘটনায় আবারও ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে গেছে। দুই দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ড কাশ্মীর নিয়ে তিনটি যুদ্ধ করেছে।
নাম প্রকাশ করতে চাননি—ভারতের এমন একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেছেন, হামলাটি এমন এক সময় হলো যখন মাত্র এক সপ্তাহ আগে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির কাশ্মীরকে পাকিস্তানের ‘জাগুলার’ (‘‘জাগুলার’’ মানে গলার শিরা বা জাগুলার ভেইন। এটি শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালিগুলোর একটি। কথ্য ভাষায় বা রাজনৈতিক ভাষণে ‘জাগুলার’ বলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জীবন-মরণের প্রশ্ন বা সবচেয়ে দুর্বল ও সংবেদনশীল জায়গাকে বোঝায়) বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের কাশ্মীরি ভাইদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে একা ফেলে দেব না।’
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক লেখক ও দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘এটি অঞ্চলটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। আমরা দেখছি, দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী এখন একে অপরের দিকে আক্রমণাত্মক চোখে তাকিয়ে আছে। এখন কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়।’
হামলার পর ভারত প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাকিস্তানের হাই কমিশনের প্রতিরক্ষা, নৌ ও বিমানবাহিনীর উপদেষ্টাদের বহিষ্কার করেছে; গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্য পথ বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং প্রথমবারের মতো সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে।
এই হামলার সময়টা রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়টাতেই যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারতে সফর করছিলেন।