চুয়াডাঙ্গা ০২:০৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শত কোটি টাকার যন্ত্রে ভর করেও থমকে যাচ্ছে কেরু: আখ মাড়াইয়ে চরম বিপর্যয়

Padma Sangbad
৭২

মোঃ আব্দুর রহমান অনিক।।
ব্যাপক প্রত্যাশা আর শতাধিক কোটি টাকার বিনিয়োগেও স্বস্তি ফিরছে না দেশের ঐতিহ্যবাহী কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডে। আধুনিকায়নের নামে স্থাপিত নতুন যন্ত্রপাতিতে বারবার ত্রুটি দেখা দেওয়ায় চলতি আখ মাড়াই মৌসুমে কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছেন আখচাষি, পরিবহন শ্রমিক ও মিল কর্তৃপক্ষ তিন পক্ষই।

মিল সূত্র জানায়, মাত্র চার দিনের (৯৬ ঘণ্টা) কার্যক্রমের মধ্যে প্রায় ৫৩ ঘণ্টাই আখ মাড়াই বন্ধ রাখতে হয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বারবার মিল থেমে যাওয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আশপাশের তিন জেলা চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিার আখচাষিদের ওপর।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আখ মাড়াই না হওয়ায় মাঠ ও মিল চত্বরে পড়ে থাকা আখ রোদে শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে আখের ওজন ও মান কমছে, একই সঙ্গে চিনি আহরণের হারও হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন কৃষক ও ট্রাক-ট্রাক্টরচালকরা; একাধিকবার মিল প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও করেছেন তারা।

২০২৫–২৬ মৌসুমে ৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে আখ মাড়াই কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। আধুনিকায়নকৃত নতুন ইউনিটে মাড়াই শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত পুরনো কারখানাতেই কার্যক্রম শুরু হয়। ৩০ ডিসেম্বর প্রথম দফার ক্রাশিং শেষ হওয়ার পর ১ জানুয়ারি নতুন ইউনিট চালু করা হলে একের পর এক যান্ত্রিক সমস্যায় মিল কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

মিলের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর ৬ ঘণ্টা, ১ জানুয়ারি টানা ২৩ ঘণ্টা, ২ জানুয়ারি ৬ ঘণ্টা, ৩ জানুয়ারি ১৫ ঘণ্টা এবং ৪ জানুয়ারি প্রায় ৩ ঘণ্টা মিল বন্ধ রাখতে হয়। মিল হাউস, বয়লার ও টারবাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশে ত্রুটির কারণেই এই অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

জায়গার সংকটে ওজন শেষে পাওয়ার ট্রলিতে আনা আখ মাটিতে ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। আবার মিলের নিজস্ব ট্রাক্টরে আনা আখ দীর্ঘ সময় গাড়িতেই পড়ে থাকছে। এতে আখ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে বহুগুণ।

উল্লেখ্য, ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত কেরু চিনিকলের আধুনিকায়ন প্রকল্পটি গত ১৩ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। ২০১২ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় প্রথমে ৪৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। পরবর্তীতে প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ১০২ কোটি ২১ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়।

প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি। তবে সাব-কন্ট্রাক্ট নেয় ভারতের একটি সুগার ইকুইপমেন্ট কোম্পানি, যারা মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেয়। পরে দায়িত্ব নেয় উত্তম এনার্জি লিমিটেড। নির্ধারিত দুই বছরের কাজ সাত দফা সময় বাড়িয়েও ১৩ বছরে শেষ করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি দেখানো হয়েছে মাত্র ৭৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।

সম্প্রতি একনেক প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। আইএমইডির সুপারিশ অনুযায়ী, এর বাইরে আর কোনো সময় বা ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই।

এদিকে ট্রায়াল রানের সময় বিকট শব্দ ও অপরিশোধিত বর্জ্যপানিতে দর্শনাবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।ছাই বাতাসে মিশে মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ ঘটছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে চিনিকলের আশপাশ এলাকার হাজার হাজার মানুষ। এ প্রসঙ্গে মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নতুন ইউনিটে আখ মাড়াই চালুর চেষ্টা চলছে। যান্ত্রিক সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

আপডেট : ১১:২৪:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬

শত কোটি টাকার যন্ত্রে ভর করেও থমকে যাচ্ছে কেরু: আখ মাড়াইয়ে চরম বিপর্যয়

আপডেট : ১১:২৪:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬
৭২

মোঃ আব্দুর রহমান অনিক।।
ব্যাপক প্রত্যাশা আর শতাধিক কোটি টাকার বিনিয়োগেও স্বস্তি ফিরছে না দেশের ঐতিহ্যবাহী কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডে। আধুনিকায়নের নামে স্থাপিত নতুন যন্ত্রপাতিতে বারবার ত্রুটি দেখা দেওয়ায় চলতি আখ মাড়াই মৌসুমে কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছেন আখচাষি, পরিবহন শ্রমিক ও মিল কর্তৃপক্ষ তিন পক্ষই।

মিল সূত্র জানায়, মাত্র চার দিনের (৯৬ ঘণ্টা) কার্যক্রমের মধ্যে প্রায় ৫৩ ঘণ্টাই আখ মাড়াই বন্ধ রাখতে হয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বারবার মিল থেমে যাওয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আশপাশের তিন জেলা চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিার আখচাষিদের ওপর।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আখ মাড়াই না হওয়ায় মাঠ ও মিল চত্বরে পড়ে থাকা আখ রোদে শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে আখের ওজন ও মান কমছে, একই সঙ্গে চিনি আহরণের হারও হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন কৃষক ও ট্রাক-ট্রাক্টরচালকরা; একাধিকবার মিল প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও করেছেন তারা।

২০২৫–২৬ মৌসুমে ৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে আখ মাড়াই কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। আধুনিকায়নকৃত নতুন ইউনিটে মাড়াই শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত পুরনো কারখানাতেই কার্যক্রম শুরু হয়। ৩০ ডিসেম্বর প্রথম দফার ক্রাশিং শেষ হওয়ার পর ১ জানুয়ারি নতুন ইউনিট চালু করা হলে একের পর এক যান্ত্রিক সমস্যায় মিল কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

মিলের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর ৬ ঘণ্টা, ১ জানুয়ারি টানা ২৩ ঘণ্টা, ২ জানুয়ারি ৬ ঘণ্টা, ৩ জানুয়ারি ১৫ ঘণ্টা এবং ৪ জানুয়ারি প্রায় ৩ ঘণ্টা মিল বন্ধ রাখতে হয়। মিল হাউস, বয়লার ও টারবাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশে ত্রুটির কারণেই এই অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

জায়গার সংকটে ওজন শেষে পাওয়ার ট্রলিতে আনা আখ মাটিতে ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। আবার মিলের নিজস্ব ট্রাক্টরে আনা আখ দীর্ঘ সময় গাড়িতেই পড়ে থাকছে। এতে আখ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে বহুগুণ।

উল্লেখ্য, ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত কেরু চিনিকলের আধুনিকায়ন প্রকল্পটি গত ১৩ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। ২০১২ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় প্রথমে ৪৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। পরবর্তীতে প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ১০২ কোটি ২১ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়।

প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি। তবে সাব-কন্ট্রাক্ট নেয় ভারতের একটি সুগার ইকুইপমেন্ট কোম্পানি, যারা মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেয়। পরে দায়িত্ব নেয় উত্তম এনার্জি লিমিটেড। নির্ধারিত দুই বছরের কাজ সাত দফা সময় বাড়িয়েও ১৩ বছরে শেষ করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি দেখানো হয়েছে মাত্র ৭৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।

সম্প্রতি একনেক প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। আইএমইডির সুপারিশ অনুযায়ী, এর বাইরে আর কোনো সময় বা ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই।

এদিকে ট্রায়াল রানের সময় বিকট শব্দ ও অপরিশোধিত বর্জ্যপানিতে দর্শনাবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।ছাই বাতাসে মিশে মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ ঘটছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে চিনিকলের আশপাশ এলাকার হাজার হাজার মানুষ। এ প্রসঙ্গে মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নতুন ইউনিটে আখ মাড়াই চালুর চেষ্টা চলছে। যান্ত্রিক সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।