পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে যশোরকে রাখা নিয়ে সংশয়

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের যশোর-ঢাকা রুটে রেল চালু নিয়ে শংকা দেখা দিয়েছে। খুলনা থেকে পদ্মবিলা হয়ে ঢাকা রুটের ট্রেন গত ১৫ নভেম্বর চালু হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এমনকী যশোরবাসীর দাবি মেনে না নিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু করলে সারাদেশের সাথে যশোর-খুলনার রেলচলাচল বন্ধ করে দেওয়ার আল্টিমেটার দিয়েছে আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফরম ‘বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি’।
কমিটির দাবি, যশোরবাসীকে বঞ্চিত করে পদ্মা সেতু হয়ে খুলনা-যশোর-ঢাকা রুটে ট্রেন চলবে তা কিছুতেই মেনে নেওয়া হবে না। এসব বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ট্রেন চালু নিয়ে ধোয়াশা রয়েছে। তবে, এসব সমস্যার আজ সমাধানেরও সম্ভাবনা রয়েছে। আজ বেলা ১১টায় রেল সচিব আব্দুল বাকীর সাথে বৈঠক করবেন বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি। ইতিমধ্যে ১০ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি ঢাকায় পৌঁছেছেন। এ বৈঠক থেকেই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে বলে প্রত্যাশা সবার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প ‘পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প’। নতুন তৈরি করা পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে এই রেলপথ ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী, নড়াইল হয়ে যশোরকে সংযুক্ত করেছে। ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকার এই মেগাপ্রকল্প থেকে ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি এক হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা খরচ কাটছাট করেছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অধীন ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল আগেই শুরু হয়েছে। ভাঙ্গা জংশনের মাধ্যমে সংযুক্ত হয়েছে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়াসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একাংশ। এখন ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হলে প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়। চলতি নভেম্বরের ১৫ তারিখের পর প্রকল্পের এই অংশে ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভাঙ্গা জংশনে সিগন্যালিংয়ের কাজ শেষ না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চলাচল শুরু করা যায়নি।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আফজাল হোসেন জানান, আগামী মাসের ১ বা ২ তারিখে ভাঙ্গা-নড়াইল হয়ে ঢাকা-যশোর বাণিজ্যিকভিত্তিতে ট্রেন চলাচল শুরু হতে পারে। নতুন এই রেলপথ চালু হলে যশোর থেকে ট্রেনযোগে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব ও ভ্রমণের সময় কমে অর্ধেকে নামবে। মাত্র তিন ঘণ্টায় ঢাকা থেকে যশোর অথবা যশোর থেকে ঢাকা যাওয়া যাবে। তবে খুলনা রুটের ট্রেন ধরতে যশোরের যাত্রীদের ব্যবহার করতে হবে পদ্মবিলা নামে নতুন জংশন; যা শহর থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে। এটা ট্রেন যাত্রীদের জন্য নতুন বিড়ম্বনা সৃষ্টি করবে। ফলে নতুন রেলপথ চালু হলেও ট্রেনগুলো যশোর অঞ্চলের যাত্রী কতটা পাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এদিকে, বেনাপোল-ঢাকা রুটে দিনে দুটি, দর্শনা-যশোর-ঢাকা রুটে দুটি এবং যশোর থেকে যমুনা সেতু হয়ে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রাখা, ট্রেনের ভাড়া সাশ্রয়ী রাখা, যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে সবজি ও ফুলবাহী বগি সংযুক্ত করা প্রভৃতি দাবিতে যশোরে বেশ কিছুদিন ধরে নাগরিক আন্দোলন চলছে।
আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফরম ‘বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির’ যুগ্ম আহ্বায়ক জিল্লুর রহমান ভিটু জানান, আজ তারা রেলসচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। কর্তৃপক্ষ দাবি না মানলে ট্রেন উদ্বোধনের দিনই যশোর জংশন অবরোধ করা হবে। এর মাধ্যমে যশোরের সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে।
এদিকে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে বর্তমানে যশোর হয়ে ঢাকায় যাতায়াতের জন্য দিনে তিনটি ট্রেন রয়েছে। এর মধ্যে বেনাপোল এক্সপ্রেস ও আন্তঃনগর সুন্দরবন পদ্মা সেতু হয়ে যাতায়াত করে। আর আন্তঃনগর চিত্রা এখনো যমুনা সেতু হয়ে চলছে। প্রতিটি ট্রেন সপ্তাহে এক দিন বিরতি আছে। নতুন রেললাইন উদ্বোধনের পর রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা-খুলনা রুটের ট্রেনগুলো যশোরের নবনির্মিত পদ্মবিলা জংশন ব্যবহার করবে। তার মানে এই রুটের ট্রেনগুলো ১৮৮৩ সালে নির্মিত দেশের অন্যতম প্রাচীন জংশন যশোরে আসবে না।
তিনি আরও বলেন, নবনির্মিত পদ্মবিলা জংশনটি যশোর শহরের কেন্দ্রস্থল দড়াটানা ও যশোর রেলজংশন থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে। এটির অবস্থান যশোর-খুলনা মহাসড়ক থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে গ্রামের মধ্যে। রাস্তার ওই অংশ সংকীর্ণ। দুটি গাড়ি ক্রসিংয়ের সুযোগও নেই। জংশনটি চালু হলে এই গ্রামীণ রাস্তার ওপর চাপ বাড়বে। দুর্ভোগে পড়বে যাত্রীরা।
এ বিষয়ে সদস্য সচিব রুহুল আমিন বলেন, যশোর ঢাকা পদ্মাসেতু লিংক প্রোজেক্ট যশোরবাসীকে আরও বেশি স্বপ্নে বিভোর করেছিল। কিন্তু প্রকল্প যত দৃশ্যমান হতে থাকলো, তখন বৃহত্তর যশোরবাসী স্বপ্ন ভঙ্গ হতে থাকলো। স্বপ্নের পদ্মা সেতু রেল প্রকল্পে যশোরবাসীর সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। পদ্মা সেতু রেল প্রকল্পের মাধ্যমে যশোরের জন্য মাত্র একটি ট্রেন রাখা হয়েছে। পদ্মবিলায় গিয়ে যশোরবাসীর পক্ষে এই ট্রেনে যাতায়াত বাস্তবতা বিবর্জিত। পাশাপাশি কোটচাঁদপুরের সাফদালপুর ও মোবারকগঞ্জ থেকে ঢাকায় যাওয়ার কোনো ট্রেনই থাকছে না। এসব সমস্যা চিহ্নিত করে রেল যোগাযোগ উন্নয়নের স্বার্থে ছয় দফা দাবি ঘোষণা করেছে সংগ্রাম কমিটি।
বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক কাওসার আলী বলেন, দর্শনা-যশোর-ঢাকা রুটে নতুন ট্রেন সার্ভিস না দিলে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর ও মোবারকগঞ্জ স্টেশন ব্যবহারকারী যাত্রীদের ট্রেনে ঢাকা যাতায়াতের সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনে কাফনের কাপড় পরে রেললাইন অবরোধ করা হবে।
তাদের দাবিগুলো হচ্ছে, পদ্মাসেতু রেল প্রকল্পে বেনাপোল-যশোর-ঢাকা রুটে ২টা, দর্শনা-যশোর-ঢাকা রুটে ২টা ট্রেন চালু এবং যমুনা সেতু হয়ে খুলনা ঢাকা রুটে চলমান ট্রেনটি বহাল রাখতে হবে। বাড়ি থেকে প্রতিদিন ঢাকায় অফিস করার সুবিধা রেখে ট্রেনের সময়সূচি তৈরি করতে হবে। আন্তঃনগর ট্রেনে সুলভ বগী (সাধারণ বগী), ভ্যান্ডার (মালবাহী বগী) কৃষিপণ্য ফুল, ফল, সবজি, মাছ বহনের জন্য যুক্ত করতে হবে। ট্রেন ভাড়া কম রাখতে হবে বাস ভাড়া থেকে। টিকিট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধনের বাইরেও ব্যবস্থা রাখতে হবে। সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকিট প্রাপ্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে ও দর্শনা থেকে খুলনা ডবল রেলপথ দ্রুত চালু করতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলী বলেন, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-যশোর খুলনা রুটে ট্রেন চলাচল করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, এখনই নিশ্চিত না। এ বিষয়ে আমরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। এছাড়া, বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আল্টিমেটাম সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার কিছুই জানা নেই।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘মূলত মাননীয় উপদেষ্টা তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকায় মঙ্গলবারই অফিস করেন। তবে, হয়তো দাবি দাবার বিষয়টি তার জানা নেই’। তিনি এ বিষয়ে উপদেষ্টার দৃষ্টিতে আনার চেষ্টা করবেন বলে মন্তব্য করেন।

























